[ভিনদেশি রুপকথার গল্প] দখিন সমীরণের উপহার! "Compiled Post"

in BDCommunity14 hours ago

সে অনেক অনেক কাল আগের কথা। হ্যামস্টারশায়ার এর এক ছোট্ট গ্রামে বাস করত পেদ্রো নামের এক ছোট্ট ছেলে। মা ছাড়া পৃথিবীতে আপন বলতে তার কেউ ছিল না। নিতান্ত গরীবিহালে চলত তাদের সংসার। কিন্তু মা-ছেলে দু'জনেই ছিল ভীষন সৎ আর ভালমানুষ।
বেচারা পেদ্রোর স্কুলে যাওয়া হয় না। হবেই বা কি করে তারাযে নিতান্তই গরীব। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা যাকে বলে আরকি। অভাবের তাড়নায় তার মা ছোট খাট যে কাজ পেতেন তাই করতেন হাসিমুখে। তার মাথায় থাকত শুধু পেদ্রোর মুখে দু'বেলা খাবার তুলে দেওয়া। পেদ্রো মাকে ভীষণ ভালোবাসত। মা তাকে সৎ আর ভালোমানুষ হবার শিক্ষা দিতেন সবসময়।
এমনিভাবেই চলছিল দিন।
তবে সময় সবসময় একিরকম থাকে না। দিনে দিনে সে মানুষকে কোথায় বা কোন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেয় তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। এই যেমন আমাদের পেদ্রো, ভালোই চলছিল তার দিনগুলো। কিন্তু হাঠাৎ করেই তা জীবনে নামে আসে এক কঠিন পরিক্ষার সময়।
তখন বসন্ত প্রায় আসি আসি করছে। পেদ্রোর মা হঠাৎ একদিন অসুস্থতার কারনে কাজে যেতে পারলেন না। ফলে কয়েকদিন মা-ছেলেকে একরকম না খেয়েই দিন কাটাতে হল। এমনিতেই পেদ্রো মায়ের কষ্ট সহ্য করতে পারত না। সে সপ্ন দেখত একদিন মাকে এই অমানুষিক যন্ত্রনার হাত থেকে রক্ষা করবে। তারা ঝলমলে রাতের খোলা আকাশের নীচে মা ছেলের কথা হয়।

পেঃ মা, তোমার কষ্ট আর সহ্য হচ্ছে না। কাল আমি বের হব রোজগারের জন্য।
ছোট্ট পেদ্রোর কথা শুনে মা হাসে। ভালোবাসায় ভরে ওঠে তার বুকটা।
মাঃ পাগল ছেলে আমার, এতটুকু ছেলে তুই, ঠিকমত নিজেই তুই চলতে পারিস না।তুই আবার কি কাজ করবি? তোকে কাজ দেবে কে? তুই আবার কোথাও যেন চলে যাস না, কেমন?
পেঃ না মা, আমি তোমার কোন কথাই শুনব না। কাল আমি বের হবই।
মার চোখে জল চলে আসে। ছোট্ট পেদ্রোর এই কথাই যেন মার জন্য যথেষ্ট।
মা বলে, সোনা মানিক আমার, কোথাও চলে যাসনা যেন। তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল? তুই হারিয়ে গেলে কাকে নিয়ে থাকব বলত?

এভাবে রাত কেটে যায়। ভোরে মার ঘুম ভাঙলে পেদ্রোকে আর দেখতে পায় না। দুশ্চিন্তায় মা এদিক ওদিক ডাকা ডাকি করে, পেদ্রোওওও...
পেদ্রোওওওওও.......
কিন্তু কোথায় কে?
মা পেদ্রোকে খুজে পায় না। অঝোর নয়নে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসায় মা।

আর এদিকে, পেদ্রো কাক ডাকা ভোরে বেরিয়ে পড়ে অজানার পথে। কত মাঠ, গ্রাম আর হাট-বাজার পেরিয়ে যায় তার ইয়ত্তা নেই। ছোট্ট পায়ে হেটে হেটে এক সময় সে এসে পড়ে বিশাল এক আপেল বাগানে। থরে থরে ঝুলছে পাকা পাকা আপেল। সকাল থেকে হাঁটছে সে, ক্ষুধাও পেয়েছে প্রচন্ড। একটা আপেল ছিঁড়ে খাবে কিনা ভাবছিল পেদ্রো। কিন্তু মায়ের বারন। কাউকে না বলে তার জিনিসে কখনোই হাত দিতে নেই। মায়ের এই শিক্ষা সে ভুলে যেতে পারে না। তাই প্রচন্ড ক্ষুধা নিয়েই আবার চলতে শুরু করে সে।

এভাবে অনেক কষ্টে বিশাল এক প্রান্তর পেরিয়ে সামনে পায় পাইন গাছের ঘন এক বন। বনে ডাকছে নাম না জানা হাজার রংবেরঙের পাখি। মৃদুমন্দ বাতাসে পেদ্রোর গা জুড়িয়ে যায়। অনেকখানি হেঁটে এমনিতেই সে ভীষণ ক্লান্ত আর ক্ষুধা তো আছেই। বড়সড় একটা গাছের ছায়ায় বসে একটু জিরিয়ে নেবার কথা ভাবে সে। একটু ভয় ভয় যে করছে না এমন নয়। তবু মায়ের সেই সজল চোখের কথা মনে হলেই পেদ্রোর মনটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে।
গাছের ছায়ায় একটুখানি জিরিয়ে আবার চলা শুরু করবে সে। সে শুনেছিল সামঅনেই আছে এক বিরাট শহর। আর শহরে কি কাজের অভাব। একটা রুটির দোকানে কাজ পেলেই কোন মতে হয়ত চলে যাবে মা-ছেলের। মায়ের কথা মনে হতেই আঝোর ধারায় কেঁদে ফেলে সে। কতক্ষণ যে কাঁদছিল তার মনে নেই। একটু ঘুম ঘুম পেয়েছিল পেদ্রোর।

এমন সময় কোথা থেকে যেন একটা ঝড়ো হাওয়ায় সে চমকে ওঠে। বনের গাছপালাকে যেন তোলপাড় করে এগিয়ে চলছে কোন এক দৈত্য। ভয়ে একেবারে চুপসে যায় পেদ্রো। হঠাৎ কে যেন হেড়ে গলায় বলে ওঠে,
কে রে ওখানে? একা একা এই বনের মাঝে কাঁদছিস?
এবার ভয়ে পেদ্রোর আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার যোগাড়। এদিক ওদিক তাকায় সে। কিন্তু কাউকেই দেখতে পায় না। সে ভয়ে ভয়ে জবাব দেয়,
-আমি পেদ্রো। তুমি কি গো?
বিরাট এক অট্টহাসির শব্দ শুনতে পায় পেদ্রো।
-আমি কে? হা হা হা!!! আমি কে? আমার বনে এসে আমাকেই বলছিস আমি কে? আমি দখিণ সমীরণ!!!
পেদ্রো বলে, ও আচ্ছা।
ওদিকটা থেকে আবার শোনা যায়,
-এতটুকু ছেলে তুই, একা একা এই বনে কি করছিস?
পেদ্রো বলে, কিছু মনে করোনা সমীরণ ভায়া। আমারাত খুব গরীব৷ মা আজ কয়েকদিন কাজে যেতা পারেননি তাই আমিই বের হয়েছি। যদি কিছু করতে পারি। মায়ের কষ্ট আর সহ্য করতে পারি না।

-অ, এই কথা। তুই ত এখনো অনেক ছোট, তুই কি কাজ করতে পারবি?

-খুব পারব। আমাকে যে পারতেই হবে।

-বল কি চাস তুই? তোকে আমার খুব ভাললেগেছে। আপেল বাগানেও দেখেছি তোকে। আপেলটা ছিড়ে খেলিনা দেখে খুব অবাক হলাম। তারপর এই বনে আবার দেখলাম তোকে। বল কি চাস?

পেদ্রো ভেবে পায়না এই অদৃশ্য কথকের কাছে সে কীইবা চাইতে পারে।
তবু বলে,
-কী আর চাইব তোমার কাছে। আমাদের খুব খাবারের আভাব। এ অভাব যদি ঘুচে যেত তবে বাড়িতে মায়ের কাছে ফিরতে পারতাম।

সমীরণ বলে,
আচ্ছা এই কথা। ঠিক আছে, নে এই মাটির হাড়িটা তোকে দিলাম। এর কাছে যা খেতে চাবি, তাই পাবি। হা হা!

এই বলে দখিণ সমীরণ কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। আর চোখের পলকে পেদ্রো দেখল তার সামনেই ম্যাজিকের মত হাজির হয়ে গেল একটা সুন্দর মাটির হাড়ি। নেড়ে চেড়ে হাড়িটা দেখল পেদ্রো। দেখতে একদম সাধারণ হাড়ির মতই।

সে ভাবে এসব বুঝি সপ্ন, ঘুম থেকে উঠলেই সব উবে যাবে। কিন্তু না, সে তো ঘুমাচ্ছে না। তাহলে কি....

আচ্ছা একবার পরখ করেই দেখা যাক না। খিদেও পেয়েছে খুব করে। সে হাড়িটা হাতে নিয়ে বলল,
-হাড়ি, ও হাড়ি।
আনো দেখি সন্দেশ মিষ্টি আর গজা হাড়ি।

ওমা একি! চোখের সামনে হাজির হল এক হাড়ি মিষ্টি-সন্দেশ-গজা। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারে না সে। পেটপুরে মিষ্টি খেয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দেয় পেদ্রো। মা কতই না খুশি হবে। তাদের খাবার কষ্ট আর থাকবে না।

কিন্তু কে জানে, কার ভাগ্য কাকে কোথায়
নিয়ে যায়। মনে মনে দখিণ সমীরণকে ধন্যবাদ দিয়ে পথ চলতে শুরু করে পেদ্রো।

এদিকে সন্ধ্যে প্রায় হয়ে আসছে।
পেদ্রো বন থেকে বের হয়ে বেশ বড় একটা মাঠে প্রবেশ করল। হাঁটতে হাঁটতে সে একটা গ্রামের কাছে চলে আসল। একটু একটু অন্ধকার হয়ে এসেছে। সে পথ চলতেই থাকল।

পথের পাশেই সে একটা সরাইখানা দেখতে পেল। আলো জলছে মিটমিট করে। পেদ্রো ভাবল এই অন্ধকারে পথ চিনে সে বাড়ি ফিরতে পারবে না। তাই রাতটা এই সরাইখানায় কাটানোর সিদ্ধান্ত নিল ও।

সরাইখানাটা দেখতে বেশ ছিমছাম আর তকতকে। ঢুকতেই সে দেখা পেল সারাইখানার মালিক জমলভ কে। জমলভ ছিল খুবই ধুর্ত টাইপের লোক। সে আদর করে পেদ্রোকে রুটি আর গোশত খাওয়াল। শোবার জায়গাটা দেখিয়ে দিয়ে জমলভ পেদ্রোকে জিজ্ঞাসা করল,
অনেকদূর থেকে আসছ বুঝি বাবা?
পেদ্রো বলল,
হু।
পেদ্রোর কাছে সুন্দর একটা হাড়ি দেখে জমলভ বলল।

জঃ হাঁড়িটাতো বেশ হয়েছে। কিনলে বুঝি?

পেদ্রো নেহায়েতই ছেলেমানুষ আর জমলভের ব্যবহারে তাকে তো বেশ ভালোমানুষই মনে হয় ওর।

সে বলল,
তুমি ঠিকই বলেছ, হাড়িটা খুবি সুন্দর। তবে এটা আমি কিনিনি, একজন উপহার দিয়েছে।

জঃ বাহ্! বেশ বেশ।

পেঃ তুমি ঠিকই ধরেছ। এ হাড়ি যেনতেন হাড়ি নয়। এযে জাদুর হাড়ি।

জঃ জাদুর হাড়ি! বল কি হে! সে আবার কেমন?
পেঃ এই হাড়ির কাছে যা খেতে চাইবে তাই পাবে।
এই বলে পেদ্রো জমলভকে দেখাল যে কিভাবে এই হাড়ি কাজ করে। চোখের সামনে এইরকম জাদুর ব্যপারটা হজম করতে জমলভের একটু সময় লাগল। সাথে সাথে একটা দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল তার মনে। সে পেদ্রোকে বলল,
ঠিকআছে এখন বিশ্রাম কর তাহলে। তোমার ম্যাজিক হাড়ি দেখে বেশ আনন্দ পেলাম।
এই বলে জমলভ চলে গেল আর পেদ্রো কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।

তখন প্রায় মধ্যরাত হতে চলল।

জমলভ তার বউকে বলল,
ছোড়াটা একটা জাদুর হাড়ি এনেছে। আমরা তো কোনদিন এরকম ভাগ্য পাব না। তুমি ঠিক ওই হাড়িটার মত একটা হাড়ি ওর মাথার কাছে রেখে দাও আর ওর হাড়িটা নিয়ে এস।

বউটা সেই মাঝরাতে পেদ্রোর জাদুর হাড়িটা বদলিয়ে ফেলল। বেচারা পেদ্রো এসবের কিছুই টের পেল না।

পরদিন সকালে পেদ্রোর ঘুম ভাঙলে সে জমলভের সরাইখানা থেকে বিদায় নিল। জমলভ হাসিমুখে পেদ্রোকে বিদায় জানাল আবার আসার জন্য অনুরোধ করল।

পেদ্রো আবার পথ চলতে শুরু করল। এদিকে বেলাও বাড়তে থাকল। পেদ্রোর মা তার চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠেছে। দুপুর যখন প্রায় গড়িয়ে যায় তখন পেদ্রো বাড়ি ফিরে মাকে ডাকল।

পেঃ মা মা। আমি ফিরে এসেছি।

পেদ্রোকে দেখেই মা কেঁদে ফেলল।

মাঃ বাছা আমার তুই কোথায় চলে গিয়েছিলি। আমি তোর চিন্তায় কেঁদে কেঁদে হয়রান হয়ে গেছিরে বাপ।

পেঃ আর কাঁদতে হবে না, মা। দেখ তোমার জন্য কি এনেছি।

এই বলে পেদ্রো মাকে হাঁড়িটা দেখাল। আর বলল,
পেঃ এ যেনতেন হাঁড়ি নয় মা, এযে জাদুর হাড়ি। এর কাছে যা খেতে চাইবে তাই পাবে।

হাড়িটা দেখে মা বেশ খুশি হলেন। কিন্তু পেদ্রো যখন মাকে হাঁড়ির ম্যাজিক দেখাতে গেল তখন সে থ বনে গেল। দেখল হাড়িটা আর আগের মত কাজ করছে না। পেদ্রো বুঝে উঠতে পারলনা কেন এরকম হচ্ছে।

এদিকে ছেলের এরকম পাগলামি দেখে মা'তো হেসেই খুন। তবে পেদ্রো বুঝল কোথাও একটা গোলমাল হচ্ছে। সে ভেবে কুল কিনারা করতে পারে না যে কেন হাড়িটা কাজ করছে না।

যাই হোক, কাল নাহয় আবার ওই বনে গিয়ে দখিন সমীরণকে বলে দেখা যাবে। সে পণ করে মায়ের কষ্ট সে লাঘব করবেই।

কেনমতে রাতটা কাটিয়েই পরদিন পেদ্রো
আবার সেই বনে হাজির হল। বরাবরের মত দখিন সমীরণ আবার হাজির হল। সে পেদ্রোর কাছ থেকে সব শুনে সমীরণ পেদ্রোকে একটা জাদুর ছাগল উপহার দিল।
আর বলল,
সঃ নে এই ছাগলটা তোকে দিলাম। এটা ব্যা ব্যা করে ডাকলেই এর মুখ থেকে বের হবে স্বর্নের টুকরা।

পেদ্রো এই কথা শুনে যেইনা ছাগলটার পিঠে চাপড় দিল তখনি ছাগলটা ব্যা ব্যা করে উঠল। আর তার মুখ থেকে ঝরে পড়ল কয়েকটা সোনার টুকরা।
পেদ্রো সমীরণকে আবার ধন্যবাদ দিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

পথে আবার সে জমলভের সরাইখানায় রাত কাটানোর জন্য থামল। জমলভের ছলচাতুরী তখনও বুঝে উঠতে পারে না পেদ্রো।

রাতে আবার সেই পুরনো ঘটনা ঘটল। জমলভের বউ কৌশলে পেদ্রোর ছাগলটা বদলিয়ে দিল। পেদ্রো এর কিছুই জানতে পারল না।
পরদিন পেদ্রো বাড়িতে ফিরল। মাকে ছাগলটা দেখাতে গিয়ে সে আবার বোকা বনে গেল। সে কিছুতেই বুঝতে পারল না কেন এমন হচ্ছে।

মনটা তার বিষিয়ে উঠলো। সব রাগ গিয়ে পড়ল সমীরণের উপর। পেদ্রো ভাবল সমীরণই মনে হয় তার সাথে কোন ছলনা করছে।
কাল সমীরণের সাথে একটা দফা রফা করেই ছাড়বে সে, মনে মনে এই প্রতিজ্ঞা করে ঘুমিয়ে পড়ে পেদ্রো।

পরদিন সকালে পেদ্রোর ঘুম ভাঙল বেশ বেলা করে। দুটো কুকি খেয়ে সে আবার পা বাড়াল সেই বনের দিকে।
মাঠ-ঘাট আর কতক গ্রাম পেরিয়ে পৌঁছে গেল সেই পাইন বনের কাছে। তখন বিকেল প্রায় গড়িয়ে গেছে। বনের মৃদুমন্দ হাওয়ায় ওর প্রানটা বেশ জুড়িয়ে গেল। সমীরণের উপর রাগটাও অনেকটা কমে গেল। কোথাও কোন জনমানবের চিহ্ন নেই। সে আস্তে আস্তে সমীরণকে ডাক দিল।

ঝড়ো হাওয়ার একটা ঝমকে হাজির হল সমীরণ। পেদ্রোকে দেখে সেও একটু অবাক হল।

সঃ তুই আবার এসেছিস? তোকে যা দিয়েছি তাতেই ত তোর বেশ ভালোভাবে চলে যাবার কথা। লোভে পড়েছিস নাকিরে পেদ্রো?

পেঃ না ভাই৷ কি আর বলব তোমাকে। তুমি যেই জিনিসই দাও বাড়িতে গেলে সেটার ম্যাজিক আর কাজ করে না। একবার দিলে হাড়ি, আরেকবার ছাগল কিন্তু বাড়িতে গিয়ে মাকে ম্যাজিকটা যেই দেখাব তখন আর কিছুই কাজ করছে না।

সঃ বল কি হে! এই সমীরণের দেওয়া জিনিস কাজ করছে না, এমনতো হবার কথা নয়। কিছু একটা গোলমাল হয়েছে নিশ্চয়।

সমীরণ কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবে। হঠাৎ পেদ্রো বলে, জমলভের সরাইখানায় ঠিকই কাজ করল কিন্তু বাড়িতে গিয়ে মাকে দেখাব, তখন আর কাজ করে না।

সঃ কি বললি, কি বললি। জমলভের ওখানে কাজ করল মানে। তুই কি বাড়ি যাবার আগে কোথাও থেমেছিলি বা উপহারগুলো কাওকে দেখিয়েছিস?

পেঃ হ্যাঁ৷ বাড়ি যেতে যেতে রাত হয়ে গেল তাইত জমলভের সারাইখানায় রাতে ঘুমিয়ে সকালে বাড়ি ফিরলাম।

সঃ অ, আচ্ছা এই ব্যপার তাহলে।

দখিন সমীরণের বুঝতে আর কিছুই বাকি রইল না। সে জমলভকে উচিৎ শিক্ষা দেবার ফন্দি আঁটল।

সঃ আচ্ছা ঠিক আছে, আমি সবকিছুই বুঝতে পেরেছি। এই নে এবার তোকে দিলাম এই বেতের লাঠিটা। আমার মনে হচ্ছে সরাইখানার কেউ তোর হাড়ি আর ছাগল চুরি করেছে। এই লাঠিই তোকে আগের সব জিনিস ফিরিয়ে দিবে।সরাইখানায় গিয়ে লাঠিকে বলবি, আমার জিনিস যে চুরি করেছে তাকে পাকড়াও কর। তারপর দেখবি মজাটা।

পেদ্রো বলল,
তুমি বলছ আমার জিনিস কেউ চুরি করেছে, তাই না? কিন্তু সেই সরাইখানায় জমলভ, আমি আর জমলভের বউ ছাড়া আর কেউ ছিল না। জমলভকে তো আমার বেশ ভালোমানুষই মনে হয়েছে।

সঃ অত কথা বলছিস কেন? তোকে যা বলল্লাম তাই কর।

পেদ্রো আর কথা বাড়াল না, সমীরণকে ধন্যবাদ দিয়ে সে আবার পথ চলতে শুরু করল।

জমলভের সরাইখানার সামনে আসতেই পেদ্রো দেখল জমলভ আর ত
তার বউ দরজাতেই বসে আছে। পেদ্রোকে দেখে তার যারপরনাই খুশি হল। ওকে আদর করে ভেতরে নিয়ে গেল।
পেদ্রো কিছুতেই বুঝতে পারল না এই ভালোমানুষরা কিভাবে তার সাথে এমনটা করতে পারে। রাতে খাবারের পর জমলভ পেদ্রোকে জিজ্ঞাসা করল,
আজ কী ম্যাজিক দেখাবে পেদ্রো? সমীরণ আজ কিছু দেয়নি বুঝি?

পেঃ দিয়েছে তো, তবে আজকের জিনিসটা একটু অন্যরকম। তোমরা ঘুমাও, কাল সকালে ম্যাজিকটা তোমাদেরকে দেখাব, কেমন?

জঃ এখনি দেখাওনা কেন। আমরা দেখার জন্য কেমন উদগ্রীব হয়ে আছি।

পেঃ অ আচ্ছা ঠিকাছে। এখনি দেখাচ্ছি।

এই বলে পেদ্রো তার ঝোলা থেকে সেই ছোট্ট বেতের লাঠিটা বের করল।
জমলভ লাঠিটা দেখে একটু আশ্চর্য হল। বলল, একি এযে একটা সাধারণ লাঠি। এদিয়ে তুমি আর কি ম্যাজিক দেখাবে?

পেঃ একে সাধারণ লাঠি ভেবোনা। এটা একটা ম্যাজিক লাঠি।

এই বলে পেদ্রো লাঠিকে বলল,
হে ম্যাজিক লাঠি, আমার জিনিস যে নিয়েছে তাদেরকে পাকড়াও কর।

আদেশ পেয়ে লাঠি জমলভ আর তার বউকে বেধড়ক পেটাতে শুরু করল। ঘটনার আকশ্মিকতায় তারা হতভম্ব হয়ে গেল।

আর এডিকে লাঠি তো তার পিটুনি থামাতেই চায় না। জমলভ আর তার বউকে এই মারে তো সেই মারে। মারের চোটে তারা চিৎকার শুরু করে দিয়েছে। বার বার পেদ্রোর কাছে তার লাঠিকে থামানোর জন্য অনুরোধ করতে থাকল জমলভ।

মারের চোটে যখন তারা দিশেহারা তখন পেদ্রো বলে, আমার হাড়ি আর ছাগল তোমরা চুরি করেছ তাইনা? লোভে পড়ে আজ তোমাদের এই দশা হল।

জঃ হাঁ, আমরাই লোভে পড়ে তোমার হাড়ি আর ছাগল বদলিয়ে দিয়েছি। আমাদেরকে মাফ কর বাপু। তোমার লাঠিকে থামাও। এই মার যে আর সহ্য হয় না। আমি এক্ষুনি তোমার হাড়ি আর ছাগল ফেরত দিচ্ছি ভাই। আমাদেরকে মাফ করে দাও।

পেদ্রো তখন তার লাঠিকে থামাতে বলল। আর তক্ষুনি লাঠি তার মার বন্ধ করল।

এদিকে মারের চোটে জমলভ আর তার বউএর আধমরা অবস্থা। কোনমতে জমলভ সরাইখানার ভেতরের একটা ঘর থেকে পেদ্রোর ম্যাজিক হাড়ি আর ছাগল্টা বের করে দিল।

পেদ্রো বলল, লোভে পড়ে আজ তোমাদের এই দশা হল। লোভ মানুষকে কোথায় নিয়ে যায় এবার বুঝলে তো!

নিজের ম্যাজিক হাড়ি আর ছাগল পেয়ে পেদ্রো খুব খুশি হল। মনে মনে সে সমীরণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলল না।

আর পরদিন সকালে সেই হাড়ি, ছাগল আর লাঠি নিয়ে পেদ্রো নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরে গেল। তাদের কোন অভাব আর কষ্টের দিন শেষ হল।

সমাপ্ত।

(বিদেশি রুপকথার গল্প থেকে অনূদিত এবং ঈষৎ পরিমার্জিত)