বর্ষাকাল
সূচনা :
“বরষা ওই এল বরষা।
অঝাের ধারায় ঝর ঝর ঝরি অবিরল।
ধূসর নীরস ধরা হল সরসা।”
শুধু কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতার লাইনটিতে বর্ষার রূপটি ফুটে ওঠেনি। বাংলাদেশের সকল কবির রচনার মধ্যে বর্ষার সবচেয়ে প্রিয়ব্ধ পটি ফুটে ওঠে। বাংলাদেশ ঋত বৈচিত্র্যের দেশ। এই ঋতু বৈচিত্র্যের মাঝে বর্ষার রূপটি বিশেষ বৈশিষ্টপূর্ণ "। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপের পর বর্ষা নেমে আসে বারি ঝরার মতাে স্নিগ্ধতা নিয়ে। অবিরল বৃষ্টির ধারার মাঝে এর রূপাট বিশেষ আকর্ষণীয়। ঘরে কষক বধুর আনন্দ, মাঠে মাঠে কৃষকের গলায় দরাজ কণ্ঠে গানের ছন্দ এবং খালেবিলে শিশুদের দৌড়ঝোপ কোলাহল সমগ্র গ্রামবাংলার জীবনকে মুখরিত করে তােলে।
আগমনী সংকেত :
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপে গ্রাম-বাংলার মানুষ যখন ক্লান্ত হয়ে মুগ্ধ চাতকের মতাে এক ফোটা বৃষ্টির আশায়। চেয়ে থাকে আকাশের পানে; অসহ্য গুমােট গরমে বুক ফাটা তৃষ্ণায় ছটফট করে মানুষের মন। তখন ঈশান কোণে জমে মেঘ। শুরু হয় আনাগােনা, হাঁক ডাক। দিগন্ত আকাশে বজ্রের হুংকার ছেড়ে বর্ষা জানায় তার আগমন বার্তা।
কবিগুরু তাঁর আগমনের চিত্র। তুলে ধরেছেন
ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে
জলসিঞ্চিত ক্ষিতি সৌরভ রভসে -
ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা
শ্যাম গম্ভীর সরসা।
দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও প্রতীক্ষার পর বর্ষা আসে। সারা আকাশ জুড়ে চলে অশান্ত মেঘের মাতামাতি। তাই কবি গেয়ে ওঠেন
“ওগাে কালাে মেঘ বাতাসের বেগে
যেও না যেও না ভেসে।”
বর্ষার রূপ :
বর্ষার দিনে সকলে যেন উদাস হয়ে যায়। হাজার এলােমেলাে স্মৃতি মনের কোণে এসে উঁকি মারে। মনের অজান্তে যেন গেয়ে ওঠে। কবি সুন্দরভাবে শিশুদের এই প্রাণচাঞ্চল্যের চিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর ছন্দোবন্ধ রচনা শৈলীতে “বর্ষাকালে নামলাে জল উঠলাে মেতে ছেলের দল শুনতে পেয়ে ভেকের রব। পুকুর পাড়ে ছুটলাে সব ছুড়তে সবাই লাগলাে ঢিল । বেশতাে দেখি মনের মিল।”
পল্লীর বর্ষা :
পল্লীর বর্ষা খুবই মনােরম। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। খাল-বিল, নদী-নালা, মাঠ-ঘাট পানিতে ভরে যায়। তখন কবি গেয়ে যায় :
“বর্ষা ঝরঝর সারাদিন ঝরছে,
খালবিল থৈ থৈ মাঠ-ঘাট ভরছে।”
এ সময়ে খালে-বিলে ও দীঘিতে উঁকি মারে শতশত শাপলা ও পদ্মফুল। গাছে শােভা ছড়ায় কেয়া, কদম, কামিনী, জুই, টগর, চাপা ইত্যাদি ফুল। বর্ষায় নদী কানায় কানায় ভরা। বর্ষায় গাঁয়ের মেয়েদের নৌকায় করে বেড়ানাের সময়। বাংলাদেশের বন্যা প্রাত্যহিক জীবনে আনে বিপর্যয়। বর্ষায় কৃষক জীবনে দেখা দেয় নিদারুণ সমস্যা। গৃহবন্দী জীবনে তাদের সংকটের শেষ থাকে না। জীবনের অনেকটা সময় কর্মহীন অপচয় হয়ে থাকে। মাঝির কণ্ঠে শােনা যায় পল্লীর বর্ষার দিনে ভাটিয়ালী গান। জেলেরা মাছ ধরার দল। . কাজে ব্যস্ত থাকে। গান গেয়ে তরী বেয়ে বিল পাড়ি দেয় মানুষ। বর্ষার পানিতে ভিজে আনন্দে মেতে ওঠে পল্লীর ছােট ছেলেদের ।
শহরের বর্ষা :
শহরে জীবনে বর্ষা আসে বিরতি নিয়ে। শহরে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সুষ্ঠু না হওয়ায় জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দেয় বর্ষাকালে। বৃষ্টির পানি জমে পরিবেশ হয়ে ওঠে অস্বাস্থ্যকর। বিঘ্নিত হয় জনজীবন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ব্যাধির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। অস্বস্তিকর পরিবেশে শহরের মানুষকে সময় কাটাতে হয়।
জীবনে বর্ষার প্রভাব :
বাঙালী জীবনের ওপর বর্ষার প্রভাব অনেক। বর্ষা এদেশের মানুষকে উদাস করে তােলে, ভাবুক - করে তােলে। তাই কবির কথা মনে পড়ে -
“হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে
ময়ূরের মত নাচেরে।”
এ সময় মনের কোণে জাগে কত কথা!'কত স্মৃতি! মনের কোণে ফুল ফোটে। বেভােলা মনে চলে স্বপ্নের জাল বােনা ।
উপসংহার :
বর্ষা একদিকে যেমন বাংলাদেশকে করে তােলে সুজলা-সুফলা তেমনি বাঙালির মনকে অপার আনন্দে ভরে তােলে করে তােলে পাগল পারা। বর্ষার দানেই আমাদের দেশ “ধন্য-ধান্যে পুষ্প ভরা”। বর্ষার সােনার হাতের ছোঁয়ায় তাে এদেশ সােনার বাংলা। বর্ষার জয়গানে বাংলা ভরপুর।
Special Thanks
@BDCommunity

