হোসেনি দালান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

in BDCommunity2 months ago

বিকালবেলায় মেডিকেল থেকে এসে স্বাভাবিকভাবে একটু ঘুমাতে হয়।এই বৃহস্পতিবার বিকালেও যথারীতি ঘুমুচ্ছিলাম।হঠাৎ আমার ক্লাসমেইট শরীফ এসে ডাকাডাকি শুরু করলো,বললো চল ঘুরতে বের হই।আমার যাওয়ার ইচ্ছা নেই,তাই জিজ্ঞেস করছি,
-কোথায় যাবি?কি করবি গিয়ে?
-চল বের হই,যেদিকে ভালো লাগে যাবো।
-না গেলে হয় না।
ও একরকম জোর করলো,পরে আরামের ঘুম ছেড়ে উঠে, প্রস্তুত হলাম যাওয়ার জন্য।বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকায় যাবো।বাসে উঠলাম,বাসে শাহবাগ যাবো এমন সিদ্ধান্তই হয়েছিলো।কিন্তু যেই বাসে উঠেছি সেটা শাহবাগ যায় না,পরবর্তীতে সেটা 'শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউট' এ নিয়ে নামালো।

বাস থেকে শরীফ প্রথমে নামলো,কিন্তু আমি নামার আগেই বাস ছেড়ে দিলো।আমাকে আরও অনেক সামনে নিয়ে নামালো,পরে দুইজন নাজিমুদ্দিন রোডে গিয়ে দেখা হলো,সেখান থেকে সামনে এগিয়ে হোসেনি দালানের কাছের একটা মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়লাম।

নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখি সামনে একটা রাজপ্রাসাদের মতো কি দেখা যাচ্ছে,সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় তেমন বুঝা যাচ্ছে না।পরে শরীফ বললো এটা নাকি 'হোসেনি দালান'।বাংলাদেশের শিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান ইবাদতের জায়গা।শিয়ারা হচ্ছে সমালোচিত মুসলমান।হোসেনি দালান মহররম মাসে টিভিতে ছোট থেকে দেখে আসছি,ভুল বাস বাঁচাই করে এই জায়গায় চলে আসছি বেপারটা ভালোই লাগলো।

হোসেনি দালানের বিরাট গেইট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম।প্রবেশ করার পর বেশ কিছু পথ হেঁটে দ্বিতল বিশিষ্ট ভবনটির দুইতলায় পৌঁছালাম।ঘ্রাণে চারপাশ মুহরিত।কারণ উপরের তলায়ই তারা তখন ইবাদত করছিলো,নিচের তলা অন্ধকার মনে হলো।
ভবনটা দেখতে মন্দিরের মতো।অনেক উঁচু ছাদ,আর চার দেয়ালের মাঝখানে অনেক খালি জায়গা,দুইভাগে বিভক্ত একটি দেয়াল দিয়ে,মাঝখানের দেয়ালে অবশ্য বড় বড় দুটি দরজা।দালানটিতে সিঁড়ি দিয়ে দুতলায় উঠার পর প্রথমেই একটি উঁচু পাকা কবর দেখা গেলো।মাজারগুলোতে কবরকে যেভাবে সাজানো হয় ঠিক ঐরকম।কবরের চারপাশ যে লোহার সীমানা দেওয়া রয়েছে,সেই লোহার দন্ডগুলোতে অনেক অনেক লাল,হলুদ কাপড় বাঁধা।ভক্তরা এসে এগুলো বাধছে।আমরা যখন গেলাম তখনও অনেকে বাঁধছিলো এই কাপড়গুলো,হয়তো কোনো ভালো কিছু হবে এই বিশ্বাসে।

আবার অনেকে দেখলাম কবরটির চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে,এটাও হয়তো তাদের ইবাদতের অংশ।কবরকে প্রদক্ষিণ করা মানুষগুলোর মধ্যে নারীদেরই বেশি দেখতে পেলাম।পরে জানতে পারলাম,এটাকে তারা নবী মোহাম্মদ(সা) এর নাতী ইমাম হোসাইন(রা) এর কবর মনে করে এসব করছে।

কবরের কক্ষটা পার হওয়ার পর আরেক কক্ষে পুরুষরা মাগরিবের নামাজ পড়ছিলো।তাদের নামাজ স্বাভাবিক মুসলমানদের নামাজের থেকে ভিন্ন লক্ষ্য করলাম।একটি ছোটো কাঠের টুকরা সিজদার জায়গায় রেখে সিজদা করছে।আরও অনেক ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখতে পেলাম।

আমি নিজে মুসলিম, তারাও নাকি মুসলিম,এখন আমার ইবাদত আর তাদের ইবাদত,আমার বিশ্বাস আর তাদের বিশ্বাসে এতো বড় ব্যবধান দেখে আমার প্রচুর ভয় হতে লাগলো।তাড়াতাড়ি সেখান থেকে বের হয়ে চলে আসলাম।তারপর দালানের পিছনে দেখলাম বড় একটি পুকুর,পুকুরে প্রচুর সাদা হাস,হয়তো এই দালানের ইবাদতকারীরাই পালন করে এগুলো।ভিতরের পরিবেশ দেখে যত ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলাম,এই শুভ্র রং এর সৃষ্টিকর্তার অপরুপ সৃষ্টিগুলো সেটা কাটিয়ে দিলো।

এই তৃপ্তি নিয়েই বের হয়ে গেলাম,হয়তো সেখানে আমার মনের অতৃপ্তির মতো অনেক কিছু ছিলো,কিন্তু শুধু শুধু মনকে অতৃপ্ত করা জিনিস গ্রহণ না করে,তৃপ্ত করা কিছু ছোট হলেও সেটা গ্রহণ করে আনতে পারাই ভালো।

হোসেনি দালান থেকে বের হয়ে নাজিমুদ্দিন রোডে কতক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম।এলাকাটা পুরান ঢাকার মতো,মানে এটা মনে হয় পুরান ঢাকাই।পঞ্চায়েত দেখলাম,বাখরখানি এসব দেখে মনে হলো পুরান ঢাকাই।তারপর সেখান থেকে হেঁটে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউট এর সামনে দিয়ে ঢাকা মেডিকেল এলাকায় গেলাম।অনেক বড় মেডিকেল কলেজ।অনেক পুরাতন আমলের দালান।এটাকেও হোসেনি দালানের মতো রাজ প্রাসাদ মনে হচ্ছে।কয়েকদিন পর ফরেনসিক মেডিসিন থেকে একটা ট্যুরে নাকি ঢাকা মেডিকেল আসা লাগবে আমাদের মেডিকেল থেকে।তাই ভাবলাম তখনই ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে মেডিকেলটাকে, এখন আর গিয়ে লাভ নেই।তাই আর ভিতরে প্রবেশ করি নি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে একটু সামনেই শহীদ মিনার,শহীদ মিনার ঘুরে তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে হাঁটা শুরু করলাম।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে কিছু খাওয়া দাওয়া করে ভিতরের দিকে কলাভবনের সামনের ক্যান্টিন থেকে কিছু খাওয়া দাওয়া করলাম।

রাত তখন নয়টা বাজে,তখনও সব শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ঘুরাফিরা করছে।লাইব্রেরিতে অনেকে পড়াশোনা করছে।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে রমনা পার্কে কিছুক্ষণ ঘুরাফিরা করে বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।বাসে উঠার আগে মোবাইল ফোনে থাকা কিলোমিটার ট্র্যাকারে দেখলাম আট কিলোমিটার হাঁটা হয়েছে।

বাসে উঠে হোসেনি দালানের ইবাদতকারী আর এই ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তার,শিক্ষার্থী আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরকে মগজের ভিতর নিয়ে জগাখিচুরি করে ভাবতে থাকলাম।জানি না,কে অন্ধকারে রয়েছে আর কে আলোতে।

IMG_20220721_204357.jpg