আমিও স্কুলে যেতাম বাবা চলে যাওয়ার আগে।

in BDCommunity5 years ago

সময় করে মাঝেমধ্যে বেরিয়ে পরতে হয় অজানা উদ্দেশ্য নিয়ে। মনকে সতেজ করতে প্রকৃতি অন্বেষণের বিকল্প নেই। তাছাড়াও নিজের চারিদিকে ভালোভাবে লক্ষ্য করলে নিজের অবস্থান উপলব্ধি করা যায়। অন্তত এইজন্য হলেও বেরিয়ে পড়তে হয় ঘন্টা খানেকের জন্য। জীবনে বৈচিত্র্য আনতে শত ব্যস্ততার মধ্যেও নিজেকে একটু সময় দিতে হয়। আশেপাশের মানুষ গুলো কেমন আছে অন্তত সেটা জানার জন্য হলেও সারাদিন অন্তর বিকেলে বেরিয়ে পরি।

আজকে হঠাৎ করেই মনে হলো নদীর ঐ পাড়ে যাই। নদীতে কোথাও পানি নেই, শুকিয়ে গেছে। এমনকি কোথাও ঝর্নাও বয় না। চারিদিকে পাখির চেচামেচি ছাড়া কোন শব্দ নেই, একদম নিস্তব্ধ। মানুষজন ও কম দেখা যাচ্ছে আজকে তুলনামূলক। নজরে পরলো ঐদুরে একটি ছোট ছেলে ঘাস কাটছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। কাছে গিয়ে লক্ষ্য করলাম ছেলেটার বয়স খুব বেশি হলেও ১৩ বছর হবে। আমি গিয়ে দাড়াতেই ছেলেটি ভয় চোখে আমার দিকে তাকালো। আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি না, শুধু ওর ঘাস কাটার দিকে তাকিয়ে আছি। আমি বুঝতে পারছিলাম ছেলেটি ইতস্তত বোধ করছে। এখন তো সব চাষযোগ্য জমিতে ধান হচ্ছে। সেজন্য মাঠে খুব বেশি জমি নাই যেখানে পর্যাপ্ত আর সতেজ ঘাস আছে। ঘাস গুলে শুকিয়ে গেছে প্রায়। জিজ্ঞেস করলাম এই ঘাস গরু কি খাবে! ছেলেটি শুধু মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলো। আমি বলছিলাম ঘাস গুলোতো মরে গেছে। ছেলেটি যেখানে বসে ঘাস কাটছে তার কিছুটা দুরেই সবুজ ঘাস দেখিয়ে বললাম ঐখান থেকে কাটতে পারো, ঐগুলা ভালো দেখাচ্ছে। ছেলেটি তখন বললো, ঐগুলা কাটতে না করছে জমি ওয়ালা।

IMG_20210316_181755.jpg

নাম জিজ্ঞেস করলাম, ভদ্রতার সাথে নাম বললো, মোঃ ইকরামুল। তখনো ভীত ছিলো মোটামুটি, তবুও আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, বাড়ি কোথায়,এখানেই? ছেলেটি এবার একটু সাহস নিয়ে বললো, না! আজুগড়া। এতো দুর থেকে আসছো! চুপচাপ! কোন উত্তর নেই। আবার জিজ্ঞেস করলাম, সন্ধায় হয়ে আসছে তো, বাড়ি যাবা না! এখন একটু লম্বা করে উত্তর দিলো চুপচাপ ছেলেটি। আমাদের ক্ষেত থেকে কে যেন ঘাস চুরি করে নেয়৷ কালকে ক্ষেতের মাঝখান থেকে কেটে নিয়েছে। সেজন্য আজকে আরো কিছুক্ষন থাকবো। দেখবো কে ঘাস কাটে। তারমানে তুমি তোমাদের ঘাস পাহারা দিচ্ছ। মাথা নাড়িয়ে হ্যা বললো।

IMG_20210316_181310.jpg

ইকরামুলের পিছন থেকে ছবিটি তোলা।

এই মৌসুমে এসে যখন ঘাসের অভাব দেখা যায় তখন কৃষকরা হাইব্রিড ঘাস চাষ করে। এক বা দেড় মাসের মধ্যেই সেগুলো গরুকে খাওয়ানোর জন্য উপযুক্ত হয়। হঠাৎ ছেলেটি জিজ্ঞেস করলো আপনার বাড়ি কি এখানেই। আমি বললাম না, নদীর ঐপাড়ে স্কুলের পাশে। মুখে হাসি নিয়ে উত্তর দিলো, আমি কিছুদিন ঐ স্কুলে পড়েছি। তাই নাকি! এখন পড়ো না? না! আব্বা মারা যাওয়ার পর আর স্কুলে যাইনি। কাকার সাথে দোকানে যেতে হয় সকালে আবার রাতে আসতে হয় সেইজন্য স্কুল থেকে নাম কেটে দেওয়াইছে মা। আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না ইকরামুল কে জিজ্ঞেস করার জন্য। চুপকরে কিছুক্ষন ওর কাজ করা দেখছিলাম।

কেমন যেন আমি চুপ হয়ে গেলাম। কোন কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য খুজে পাচ্ছি না। আসার আগে শুধু জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের গরু কয়টা! ছেলেটি উত্তর দিলো আমাদের দুটো গরু আর একটি ছাগল।

Sort:  

অনেক স্বপ্ন এভাবেই ধুপ করে মরে যায়।