নদী, মেঠোপথ, সবুজ প্রকৃতি আর মানুষ যেখানে এক হয়ে মিলেমিশে থাকে, ঠিক তেমনই এক গ্রামে গড়ে উঠেছিল আশির দশকে আমাদের শৈশব। আলী আব্বাস, নজরুল, লিয়াকত, শওকত, কাদের সবাই একসাথে শৈশব কাটিয়েছি প্রকৃতি ঘেরা একটি গ্রাম ও নদীর তীরে।আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, বুকের ভেতর কেমন যেন এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে হয়, এই তো সেদিন—নদীর উপর দিয়ে বয়ে চলা নৌকার ইঞ্জিনের শব্দে ঘুম ভাঙত, আর সন্ধ্যার শান্ত বাতাসে নদীর বুকে নৌকার হ্যারিকেনের আলো দেখে দিন শেষ হতো।

এইতো সেদিন সন্ধ্যার পর নদীর চারপাশে আলো জ্বলজ্বল করতো। নৌকার আলো ছাড়াও নদীর চারপাশে বর্ষি নিয়ে মাছ ধরার জন্য বসে থাকতো মনে শখ ভরা মানুষগুলো।আজকের এই যান্ত্রিক বা ডিজিটাল যুগের কোনো অনুষঙ্গই আমাদের তখন ছিল না, কিন্তু যা ছিল তা এক মহাসমুদ্র সম আনন্দ। আমার শৈশবের পুরোটা ক্যানভাস জুড়েই জড়িয়ে আছে সেই রূপালী নদী বা গ্রামের মেঠো পথ, কাদামাটির গন্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি।
সকালে ঘুম ভাঙতো সুন্দর সুন্দর সব পাখিদের কল-কলানি শব্দে। ভোর হলেই শুনতে পাওয়া যেত মোরগের সুমধুর ডাক। এরপর দিনের শুরুটাই হতো নদীর সাথে কারণ ঘুম থেকে উঠেই আমরা নদীর পানিতে ফ্রেশ হতাম। শীতের সকালে কুয়াশা ভেজা কৃষি জমিতে গিয়ে একটি পাত্রে কুয়াশা সংগ্রহ করে মাথায় প্রয়োগ করতাম এবং বলতাম এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।। শীতের ভোরবেলা কুয়াশাভেজা কিংবা মিষ্টি রোদের সকালে নদীর ঘাটে মানুষের কোলাহল শুরু হয়ে যেত।আমাদের দিন কাটত নদীর বালুর ওপর দৌড়াদৌড়ি করে, বালু দিয়ে ঘর বানিয়ে কিংবা কাশবনের আড়ালে লুকোচুরি খেলে।

আর দুপুর মানেই ছিল এক মহা উৎসব। দুপুর হলে পাড়ার সব বন্ধুরা মিলে একসাথে নদীতে ঝাঁপ দেওয়া, সাঁতার কাটা, আর কে কতক্ষণ পানির নিচে ডুব দিয়ে থাকতে পারে—তার প্রতিযোগিতা করা। চোখ লাল করে যখন নদী থেকে বাড়ি ফিরতাম, মায়ের বকুনিতেও এক অদ্ভুত ভালোবাসা মাখানো থাকত। কখনো কখনো নদীর পানি থেকে উঠতে চাইতাম না তখন মা একটি লাঠি দিয়ে তাড়িয়ে যেত। আজ মা নেই তাই মনে পড়ে সেই দিনগুলো আর চোখের পানি ঝরে।
আমাদের আশির দশকের সেই দিনগুলোতে বিনোদনের মাধ্যম ছিল খুব সীমিত, কিন্তু অনেক বেশি প্রাণবন্ত। আজ আমরা কেউ একসাথে নাই সকল বন্ধু-বান্ধব কোথায় রয়েছে তার কোন খোঁজ খবর নাই। আমরা বন্ধুরা রেডিওতে গান শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম কিংবা দাবা খেলায় নিয়ে মাতামাতি করতাম। আরো ছিল আমাদের হাডুডু খেলা, কিংবা মাঝেমধ্যে পাড়ার কারও বাড়িতে সাদাকালো টেলিভিশনের সামনে পুরো মহল্লা হুমড়ি খেয়ে পড়া।

তখন একটি বাড়িতে টেলিভিশন থাকা মানে সেটি অবস্থা সম্পন্ন বাড়ি।সে এক অন্যরকম উন্মাদনা ছিল। বর্ষায় যখন নদী ফুলে-ফেঁপে উঠত, তখন নৌকায় চড়ে পুরো চক ঘুড়ে বেড়াতাম। কলা গাছ কেটে এক ধরনের ভুরা বানাইতাম। বর্ষার দিনে কলা গাছের তৈরি সেই ভুরা যেন আমার চোখে এখনো ভাসে।
আমাদের প্রিয় খেলার স্থান ছিল নদীর তীর।নদী শুধু আমাদের খেলার সাথিই ছিল না, ছিল আমাদের বেঁচে থাকার স্পন্দন। ঘাটে এসে ভেড়া বড় বড় গয়না নৌকা, হাটবারে লোকজনের ব্যস্ততা, আর মাঝরাতে দূর থেকে ভেসে আসা কোনো মাঝির কণ্ঠের গান। দূর থেকে দেখতাম বাদামী উড়ানো নৌকা এদিকে আসতেছে। বর্ষা মাসে নৌকা বোজাই আখ কিংবা পাটের সেই দৃশ্যগুলো আজও চোখে ভাসে।সব মিলিয়ে এক রূপকথার জগৎ ছিল আমাদের সেই আশির দশক।

ব্যস্ততম এই জীবনে তাই আজ Hive-এর বন্ধুদের সাথে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সেই সময়টা ভাগ করে নিলাম। আমাদের গ্রাম কিম্বা নদী এখন হয়তো অনেক বদলে গেছে, বদলে গেছি আমরাও। কিন্তু আমার ভেতরের সেই নদীপাড়ের দুরন্ত শিশুটি আজও আশির দশকের সেই চরেই হারিয়ে বেড়ায়। মনে পড়ে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে নদীর তীরে কিংবা বিকেলে কৃষি জমির মাঝে কাটানো সেই সময়গুলো।আপনাদের শৈশব কেমন কেটেছিল বন্ধুগণ? আপনার শৈশবের মুহূর্ত কমেন্টে আমাকে জানাতে ভুলবেন না!
Posted Using INLEO
Congratulations @writinglovers! You have completed the following achievement on the Hive blockchain And have been rewarded with New badge(s)
Your next target is to reach 3750 upvotes.
You can view your badges on your board and compare yourself to others in the Ranking
If you no longer want to receive notifications, reply to this comment with the word
STOPCheck out our last posts:
✅ Your post has been successfully curated by @banglahive!
🌟 Connect & Grow with Us:
👥 Join Our Community
💬 Join Our Discord Server
🤝 Follow Our Curation Trail
🟢 Support Bangla Hive:
Help us reward talented creators like you! Please consider supporting our community with an HP Delegation.