কবি জসীমউদ্দীন: যার প্রতিটি লাইন থেকে পাওয়া যায় মাটির গন্ধ

in BDCommunity6 years ago

বাংলা সাহিত্যে অনেক প্রতিভাবান কবিতা এসেছেন কালে কালে। রচনা করে গেছেন অসাধারণ পংক্তিগুলো। তাদের অনেকে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছেন.. আবার অনেকেই এখনো স্বমহিমায় দীপ্তমান।

বিশ্বসাহিত্যের দিকে যদি আমরা তাকাই.. বিভিন্ন দেশের অসংখ্য গুণধর লেখক-কবি-সাহিত্যিক পাওয়া যায়.. তবে সারা জীবন একটি নিজস্ব স্টাইল অনুসরণ করে লিখে যাওয়া সফল কবিদের সংখ্যা খুবই সীমিত। বাংলা সাহিত্যে এই সংখ্যাটা আরো কম।

images (11).jpeg
কবি জসীমউদ্দীন, এক ভিন্নমাত্রার কবি

একটা লাইন পড়লেই- কার লেখা সেটা বুঝতে পারা যাবে.. এরকম কবিদের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম হলেন কবি জসীমউদ্দীন। তার প্রতিটি কবিতা থেকে.. কবিতার প্রতিটি লাইন থেকে.. লাইনের প্রতিটি শব্দ থেকে.. যেন এই দেশের মাটির গন্ধ পাওয়া যায়। এরকম গ্রাম-ঘনিষ্ঠ, প্রকৃতি-প্রেমিক কবি বাংলা সাহিত্যে খুব কমই আছে।

কবি জসীমউদ্দীন এদেশের চাষাভুষার ভাষায় কবিতা লিখেছেন.. যেটি তার পূর্বে সফলভাবে কেউ করতে পারে নি। তার কবিতার সারল্য এবং অকৃত্রিমতা সবাইকে মুগ্ধ করে। তার কবিতা অনেকটা গ্রামীণ সরল ল্যান্ডস্কেপ চিত্রের মত.. যা উপভোগ করতে আপনার খুব বেশি ব্রেইন স্টর্মিং-এর প্রয়োজন হবে না.. সহজ রসের সমাহার তার প্রতিটি পংক্তিতে.. কিন্তু এই সহজতার মাঝে এক ধরনের কোমল সৌন্দর্য উচ্চারিত হয়.. যে কারণে তার দীর্ঘ কবিতা গুলো লাইনের পর লাইন পড়ে গেলেও ক্লান্তি আসে না।

কবি জসীমউদ্দীন ছাত্রাবস্থাতেই ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন.. তার কবর কবিতা যখন প্রকাশিত হয়.. তখন তিনি কলেজ স্টুডেন্ট। এই কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন.. এবং দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন। এটাও বাংলাদেশে বিরল। সাধারণত একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত লেখালেখি করে পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে থাকেন কবিরা।

maxresdefault.jpg
জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত কবর কবিতার কয়েকটি লাইন

কিন্তু জীবনের শুরুতে ছাত্রাবস্থাতেই ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পাওয়া সত্ত্বেও স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন নি কবি জসীমউদ্দীন। তিনি যেন সেই সচেতন শিল্পী.. যিনি তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনাতেই পুরো জীবনের পথ-পরিক্রমা পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন.. এবং সে মতে তিনি হেঁটেছেন.. একটুও পা পিছলে পড়ে নি.. কিংবা একটুও অন্য পথে উঁকি মারে নি।

এই এক রহস্য! কবিদেরকে সাধারণত দেখতে পাওয়া যায়- একটু ব্যতিক্রম কিছু করার প্রচেষ্টা করে যেতে.. কিন্তু জসিমউদ্দিন যেন তার নিজের সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা রাখেন। তার শক্তিমত্তা, দুর্বলতা সম্পর্কে যেন তিনি একনিষ্ঠ ভাবে অবগত ছিলেন.. যে কারণে তিনি তার শক্তির জায়গা থেকে এতটুকু বিচ্যুত হন নি। ফলে নকশী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট সহ আরো অসংখ্য দীর্ঘ গীতিকাব্য একই ধাঁচে রচনা করে গিয়েছেন.. যদিও কবিতাগুলোর একটার সাথে আরেকটার পার্থক্য অনেক বেশি.. কিন্তু একটি কমন টেস্ট তার কবিতাগুলো থেকে পাওয়া যায়।

তিনি তুজম্বর আলী ছদ্মনামে লিখতেন.. মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি এই ছদ্মনাম ব্যবহার করে স্বাধীনতার পক্ষে কিছু কবিতা লেখালেখি করেন। যদিও এই অবদান নিয়ে খুব একটা আলোচনা বাংলাদেশে হয় না।

কবি জসীমউদ্দীনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তার উপমা। উপমার ক্ষেত্রে তিনি এমন সব নতুন গ্রামীন উপসঙ্গ-অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন... যা পাঠকদেরকে বরাবরই চমকে দিয়েছে। যেমন- কচি লাউয়ের ডগার মত কচি তাহার বাহু... কিংবা মন সেতো নয় কুমড়ার ফালি, যাহারে তাহলে কাটিয়া বিলানো যায়... এরকম আরো অসংখ্য চমৎকার উপমার ছড়াছড়ি পাওয়া যায় তার কবিতায়। এটাও একটা নতুনত্ব। বাংলা সাহিত্যে এরকম প্রাকৃতিক গ্রামীণ উপমা জীবনঘনিষ্ঠ ভাবে উপস্থাপন এর আগে এতটা সফলতার সাথে কেউ করতে পারে নি।

images (12).jpeg
কবি জসীমউদ্দীন এর বাসভবন

তার নকশী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, কবর ইত্যাদি দীর্ঘ কবিতাগুলো যখন আমরা পড়ি.. তখন ক্লান্তি আসে না। অথচ অন্য কবিদের বেশীরভাগ দীর্ঘ কবিতা পড়ার পর একটা সময় আমাদের ক্লান্তি চলে আসে। এটা তার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আপনি দীর্ঘ কয়েক শত লাইনের কবিতা এক নিঃশ্বাসে.. এক বসায় পড়ে ফেলতে পারবেন.. অনেকটা হুমায়ূন আহমেদ কিংবা শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের মতো। তিনি উপমা, শব্দচয়ন, ছন্দ প্রকরণ, অন্তমিল, অন্তর্নিহিত অর্থ, গল্প ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে সরলতাকে প্রাধান্য দিতেন.. যে কারণে তাঁর কবিতায় গীতিকাব্য-ছড়ার একটি কম্বিনেশান পাওয়া যায়।

গ্রাম নিয়ে বাংলা সাহিত্যে আরও অনেকে কবিতা লিখেছেন.. রবীন্দ্রনাথ তাঁর বহুমাত্রিকতায় গ্রামকে বারবার এনেছেন.. কাজী নজরুল তাঁর স্বভাবসুলভ ছন্দে গ্রামকে দিয়েছেন ভিন্ন মাত্রা.. জীবানন্দ দাস তার আধুনিক প্রকরনে গ্রামকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন.. আল মাহমুদ লোকজ শব্দের সুনিপুণ প্রয়োগের মাধ্যমে গ্রামীণ অনুষঙ্গগুলো আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছেন..

কিন্তু জসিমউদ্দিন হেঁটেছিলাম ভিন্ন এক পথে। যে পথে তাঁর পূর্বেও কেউ হাঁটে নি.. পরেও খুব বেশি কেউ সে পথে হাঁটতে পারে নি। এই পথ তার একাকী পথ.. এবং কেউ যদি বাংলা গ্রামীণ চিত্র উপভোগ করতে চায় শব্দের চিত্রকলায়, তাকে অবশ্যই সেই পথে হাঁটতে হবে.. তাকে অবশ্যই পড়তে হবে জসীমউদ্দীনের কবিতা।

images (13).jpeg
কবের প্রতিকৃতি

Sort:  

Hi @bdkabbo, your post has been upvoted by @bdcommunity courtesy of @linco!


Support us by voting as a Hive Witness and/or by delegating HIVE POWER.

JOIN US ON