অজুহাতের এক হাত

in BDCommunity3 years ago

এই খোঁড়া একাডেমিক সিস্টেম নিয়ে আক্ষেপ করে কোনো সুরাহা না হইলেও, শিক্ষকতারতো সুরাহা হইতে পারে।
শিক্ষার সিস্টেমে যতই গন্ডগোল থাক, শিক্ষকতার সাফল্যে তার অধিকাংশই মুছে দেয়া যায়। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে শিক্ষকরা দাপট দেখাতেই কেনো যেনো ব্যস্ত৷
মনে আছে, ফাইনালের ভাইভা যেদিন থাকতো, কি এক জঘন্য বিচ্ছিরি অনুভূতি। এমনও হয়েছে শুধু ভাইবার পড়া পড়তেও দুই কেজি ওজন কমে গেছে কয়েকদিনের ব্যবধানে।

খাওয়ার অনিয়ম, নির্ঘুম, প্রচন্ড ভয়ংকর স্ট্রেস, এংজাইটি, ডিপ্রেশন, ভীতি, আর প্রচুর পড়া, যে পড়ার সিলেবাসের কোনো এ মাথা ওমাথা নেই।
ভাইবা হলের সামনে বসে অনেক অজ্ঞান হয়ে গেছে স্ট্রেসের চোটে এরকমও আছে।
ফার্মাকোলজির কথা বলি। পোলাপান পড়ে ফাটায়ে ফেলতেসে। বিটা-ব্লকার, আলফা-ব্লকার, এনএসএআইড, এন্টিবায়েটিক, তাদের জেনারশন, রেসিস্ট্যান্স, অল্টারনেটিভ, সোজা কথায় সিস্টেম অনুসারে অর্গান, অর্গান অনুসারে রোগ, আর এই রোগ অনুসারে অষুধ...এখানেই শেষ না, সেই সব অষুধের ইন্ডিকেশন, কন্ট্রাইন্ডিকেশন, এডভার্স ইফেক্ট, অই একই অষুধ আরো অন্য কি কি রোগের জন্য ব্যবহৃত কেনো হয় বা হয়না, বিটা-ব্লকার কাদের দিবানা, কেন দিবানা, পিপিআই... ইত্যাদি ইত্যাদি (আরো আছে কাহিনী)
এই যে এই আকাশ-পাতাল করে ফেলা একটা মাত্র সাবজেক্ট আর এতগুলো জিনিস মুখস্থ, ঠোটস্থ রাখা, এক/দুই রাতের মধ্যে রিভাইস দেয়া ভাইভা হলে পা দেবার আগে... এরপর ওখানে যেয়ে কি প্রশ্ন হয়?

আমার ধারণা ছিল যে শিক্ষক আমরা চাইনি সেই শিক্ষক আমরা হবো না। এবং ধারণা না আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম যে এই আমরা পাঁচ বছর পরে বেরিয়ে যখন, শিক্ষকতায় যোগ দিব আমরা সমাজটাই বদলে দিব।
আমরা ছাত্রদের সেই ভাবে পড়াবো যেটা আমরা আমাদের শিক্ষকদের কাছে চেয়েছিলাম, আমরা ছাত্রদের ততটুকু নিকটে থাকবো যে নৈকট্যের অভাবে আমরা ভুগেছি পুরোটা সময়। আমরা ছাত্রদের সেই মূল্যায়ন করব যে মূল্যায়ন আমরা বারংবার ব্যর্থ হয়েছি পেতে।
এবং সেদিনই বোধহয় আমার প্রথম স্বপ্নভঙ্গ হয়, যেদিন আমি অবাক হয়ে দেখলাম আমরা আমাদের শিক্ষকদের যেইসব ব্যাপারে অসুখী ছিলাম, অভাবে ছিলাম ঠিক সেগুলাই আমরা হয়েছি।
কেন যেন শিক্ষক হবার পর আমরা ভুলে গেলাম তাদেরকে ভয় দেখিয়ে ধমক দিয়ে বুঝতে সাহায্য না করে শিক্ষক হবার দাপট দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখবার মত শিক্ষক আমাদের হবার কথা ছিল না।

আমি প্রশ্ন করেছিলাম খুব আক্ষেপ নিয়ে যে, কেন?
কিছু উত্তর ছিল এটাই সিস্টেম ওদেরকে লাইনে রাখবার।
কিন্তু ওরা তো অপরাধী না! জেলখানায় ওদেরকে করবার জন্য তো আমরা আনিনি!
ওদেরকে আমরা নতুন আলোর দরজা উন্মুক্ত করে দিতে শেখাতে এসেছি, সে দরজার ওপারের সে পথ, সে পৃথিবী চলতে শেখাবার জন্য এসেছি।
গ্রাজুয়েট স্টুডেন্টদেরকে পড়ানো আর স্কুল-কলে কলেজে পড়ানো তো এক হতে পারে না। ওটাকে এডাল্ট লার্নিং বলে।
আপনি এডাল লার্নিং এডাল্টদের লারনার্সদের বাচ্চাদের মত মেরে ধরে, অপমান করে, খোঁটা দিয়ে, ছোটো করে পড়ালে তো হবে না।
কারণ ততদিনে ওরা "আত্মসম্মানবোধ" নামে একটা অস্তিত্বের খোঁজ পেয়ে যায়।

অ্যাডাল্ট লার্নারসরা সিদ্ধান্ত নিতে জানে, বাছাই করতে শেখে, স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে। পুরোপুরি অবগত না হলেও তারা যে একটা "সেল্ফ" বলে সত্তা আছে সেই সত্তাটার সাথে পরিচিত হওয়া শুরু করে।
আর সেই জন্যই তাদেরকে পড়ানোটা আমাদের এত সহজ ভাবে নেওয়া উচিত না।
তাদেরকে অপমান করা যাবেনা, খোঁচা দিয়ে আঁতে ঘা দেয়া যাবেনা, বড়জোর স্নেহের বকা দিতে পারেন খুব বদমায়েশি করলে কিন্তু অতটুকুই।
বরং প্রচুর বোঝাতে হবে, সময় দিতে হবে।
আমাদের কেন যেন এক অদ্ভুত ধারণা জন্মে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছাকাছি গেলে, ওদের কথা শুনলে, ওদের বন্ধু হলে আমাদের বোধহয় সম্মান থাকবে না। আর এজন্য আমরা কখনো ওদের বন্ধু হতে পারি না।
অ্যাডাল্ট লার্নার্সদের জীবনে শুধু পড়াশুনাই থাকেনা আরো বহুবিধ চিন্তা, ভাবনা, অবস্থা যুক্ত হয়, এটা জীবনের এমনই এক অভিনব সময়। হঠাৎ করে পুকুর থেকে নদীতে এসে পড়ার মতো।
তারা এই নতুন জীবনে মানিয়ে নিতে এতই খাবি খায়, তার মাঝে মাঝে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে না পারার মত ব্যর্থ শিক্ষকতা, ওদেরকে আরো বেশি বিপর্যস্তই করে, ওদের পথ আলো করে না।

শিক্ষকতা শুধু মুখস্ত করানোই না, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করাও না, মুহুর্মুহু এসাইনমেন্ট দিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে রাখাও না, ভাইবা হলে যমরাজের মত বসে থাকাও না...

অন্তত আমার সিনিয়র বা ব্যাচের যারা শিক্ষক হয়েছেন, আমার জুনিয়র যারা শিক্ষক হয়েছেন, শিক্ষক হবেন, আমার প্রিয় ছাত্ররা যারা শিক্ষক হতে চায়, সকলের কাছে অনুরোধ শিক্ষা সিস্টেমের দোহাই দিয়ে আপনার খোঁড়া শিক্ষকতা কে প্রচার করবেন না।
সিস্টেম আপনাকে সিলেবাস দিয়েছে কিন্তু সিলেবাস কিভাবে পড়াতে হবে সেটা তো নির্ধারণ করে দেয়।
সেখানে আপনি কিভাবে পড়াবেন তা এক্সপ্লোর করবার মতো যথেষ্টই জায়গা আছে।
সুতরাং এমন শিক্ষক হবেন না যাকে সামনে সালাম দিয়ে পেছনে গালি দেয়।
এমন শিক্ষক হন যাকে নিয়ে আপনার ছাত্র-ছাত্রীরা বলবে, "জানেন আপনাকে নিয়ে এখনো আমাদের পাড়ায় গল্প হয়"

আমারে একটা চাকরি ছাড়ার পরে আফসোস হয়েছিল। লেকচারার হিসেবে সেটা আমার প্রথম চাকরি প্রথম স্বপ্ন পূরণ শিক্ষক হয়ে উঠবার।
খুব অল্প সময় পেয়েছিলাম।
প্রচন্ড অল্প সময়।
নিজের যে থিওরি সেটাকে এক্সপ্লোর করে করা শুরু করেছিলাম কেবল, কিন্তু ইতি টানতে হলো ওখানেই।
তাতে অবশ্যই ভুল ত্রুটি ছিল।
তবুও বলতে হবে আমার সৌভাগ্য, আমি ওদেরকে পুরোটা না পেলেও ওরা আমাকে বিদায়ের পরে আরো বহুদিন ধরে দখল করে রেখেছে।
এবং আমার অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি বিশ্বাস করুন ছাত্র-ছাত্রীদের বন্ধু হলে, শিক্ষক হিসাবে আপনার সম্মান কমে যাবে না, বরং আপনি দেখবেন যে, চারা গাছগুলো সঠিক আলো ছায়া পেলে কিভাবে ফুর ফুরিয়ে বেড়ে ওঠে আর কি চমৎকার সব মানুষ হয়।

আর অবশ্যই মনে রাখবেন, কেবল দু'চারটা স্লাইড বানিয়ে, কিংবা বই খুলে রিডিং পড়ে দিয়ে, কিংবা যুগ ধরে চলে আসার নোট সাপ্লাই দিয়ে শিক্ষকতা হবে না। যেদিন আপনি বুঝবেন আপনার একটা ক্লাসের জন্য ছাত্রদের থেকে কয়েক গুণ বেশি পড়া আপনার পড়তে হচ্ছে, সেদিন বুঝবেন আপনি আদর্শ শিক্ষক হবার পথে প্রথম ধাপটাই এগিয়ে গেছেন।
এতে লজ্জার কিছু নেই।
যেদিন আমার ক্লাস থাকতো সেদিন রাতে আমি এত পড়াশুনা করতাম যতটা আমি নিজে ছাত্রাবস্থায় এমনকি ফাইনালের আগেও পড়িনি।
কারণ ছাত্রী হিসেবে আমি ফাঁকিবাজি করতেই পারি, কিন্তু শিক্ষক হিসেবে ফাঁকিবাজি করার এক বিন্দু জায়গা নেই। এটা স্বীকার করতেও কুন্ঠাবোধ নেই।
আমি শিক্ষক, ওরা ধরে নাই সব প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে আছে।
তাই সব প্রশ্নের উত্তর আমার জানা থাকা চাই।
আর জানা না থাকলেও সেটা ওদের সামনে অস্বীকার করবারও দরকার নাই।
পড়ে এসে জেনে এসে জানানো যাবে।
এতে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।


image_78972874-9ac1-4658-ba0d-bf26ff02ee8a20230726_025008.jpg

এখন ভাবতেই পারেন এত হাঙ্গামা করবার দরকারটা কি।
এ প্রশ্নের উত্তর আমি আপনাকে বলে-লিখে দিতে পারব না। এই উপলব্ধিটা আপনার নিজের করতে হবে। আর যদি পারেন, যেদিন এসে ছাত্র-ছাত্রীরা আপনাকে বলবে "জানেন! আপনাকে নিয়ে এখনো আমাদের পাড়ায় গল্প হয়!"
সেদিন বুঝবেন, এই কথাটা কিভাবে কোথায় গিয়ে লাগবে।

All the contents are mine until it’s mentioned 

Sort:  

Hi @fahmidamou, your post has been upvoted by @bdcommunity courtesy of @rem-steem!


Support us by voting as a Hive Witness and/or by delegating HIVE POWER.

JOIN US ON