আসালামুআলাইকুম,
https://picsart.com/i/329567750004211
বাবা কেমন আছো তুমি?
তোমাকে ছাড়া প্রতিটা ঈদ যেন আমার নিরানন্দে যায়। তোমার ভালোবাসা খুঁজে বেড়ায় প্রতিটা ঈদে।বাবা এখনো মনে হয় তোমার সাথে কেটে যাওয়া সেই দিনের কথা, কোরবানি ঈদের দুদিন আগে থেকে তুমি জিজ্ঞেস করতে,
কোরবানির গরু কিনেছে কিনা? কিভাবে কোরবানির গরু মাংস ভাগ বন্টন করতে হবে,তোমার থেকেই তো শিখেছি আমি।
বাবা তুমি যখন পৃথিবীতে ছিলে,ঈদ গুলো ছিল অন্যরকম এক আনন্দের ।কারণ ঈদের দিন তুমি ফোন দিয়ে মোবারকবাদ জানাতে,তখন জানো বাবা এতো আনন্দ লাগতো, এখন আর সেই আনন্দটা লাগেনা কারণ তুমি নেই পৃথিবীতে।আমার মনে হয় পৃথিবীর অর্ধেকটা,যেন চলে গেছে আমার জীবন থেকে।এখন তোমার মত করে আমার খোঁজ খবর কেউ নেয় না।
তুমি সব সময় বলতে আমার মেয়েটা অনেক দূরে থাকে।আমার মেয়েটার খোঁজখবর আগে নিতে হবে,আমি জানতাম তুমি আমাকে খুব ভালবাসতে। আমাকে বেশি ভালবাসতে বলে, অন্য ভাইবোনেরা হিংসে করত। অনেক সময় বলতো ভাই-বোনেরা বাবা তুমি আপুকে বেশি ভালোবাসো আমাদেরকে ভালোবাসো না

আমার ছোট ভাই বোনেরা জানত না, বাবা-মা সব ছেলেমেয়েকে অনেক ভালোবাসে।তবে কেন যেন বলতো আমার বাবা সবসময় আমার বড় মেয়েকে আমি প্রচন্ড রকম ভালবাসি,সবসময় বাবা আমার কথাই বলতো। হয়তো এই জন্য আমার ছোট ভাইবোনদের হিংসে হতো।
বাবা মনে আছে তোমার? ঈদের সময় ছুটিতে আসতে।ঈদের দিন সকালে তুমি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে, আমাদের সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতে।সকালে গোসল করিয়ে দিতে আমাদের।বাবা,আমাদের তখন কোন ভাই ছিলনা। বাবা,গোসল করাতে যখন গ্রামের মানুষেরাই বলতো,মেয়েদেরকে এত সকালে গোসল করিয়ে লাভ কি?
মেয়েরা কি নামাজ পড়তে যাবে নাকি?
এগুলো বলে ওরা হাসাহাসি করত তাই না বাবা? বাবা, কখনো তুমি আমাদের পাঁচ বোনকে অবহেলা করোনি,বুকের মধ্যখানে আগলে রেখেছ আমাদের। গোসল করা হয়ে গেলে,নতুন কাপড় পরিয়ে ঈদগাহে নিয়ে যেতে। তুমি নামাজ পড়তে যেতে, ঈদগাহের পাশে মেলা বসতো, মেলাতে আমরা হরেক রকমের জিনিস কিনার জন্য টাকা দিয়ে যেতে।
এখনও এই কথা মনে হলে বুক ফেটে কান্না আসে, এইতো কয়েদিন হল সেই দিনগুলো চলে গেছে।এই কথা মনে হলে ছল ছল করে চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
মনে হয় সেই দিনের কথা, নামাজ শেষ হলে আমাদের নিয়ে বাড়ি ফিরে আসতে। সবাই মিলে গরু কোরবানি দিতে, কোরবানি দেওয়ার পর প্রথমে তুমি গরুর কলিজা বাড়িতে পাঠাতে আমাকে দিয়ে,তোমার খুব পছন্দের ছিল গরুর কলিজা। তুমি গরুর কলিজা ভুনা, পোলাও রান্না করার জন্য সবসময়ই আমার মাকে বলে রাখতা। আমি যখন কলিজা পাঠাবা তখন তুমি কলিজা ভুনা করবা আর পোলাও রান্না করবা।
মা তোমার জন্য কলিজা রান্না করে রাখত, তুমি কোরবানির সব কাজ শেষ করে। ঘরে এসে আমাদের নিয়ে খেতে বসতে, তবে বাবা অনেক সময় আমাকে তুমি বকা দিতে। কারণ আমি গরুর কলিজা খেতে চাইতাম না বলে।আমার কাছে গরুর কলিজা ভালো লাগতোনা,তাই তুমি সবসময় বলতা গরুর কলিজা না খেলে কি শক্তি হবে।
জা জানো বাবা? এখন আমি গরুর কলিজা খেতে খুব পছন্দ করি। আমি যখন গরুর কলিজা খাই,তখন তোমার কথা খুব মনে পড়ে,কারণ তোমার পছন্দের জিনিসটি আমার যে খুব পছন্দের হয়েগেছে। খেতে চাইতাম না তুমি বকা দিতে,এখন তুমি পৃথিবীতে থাকলে অনেক খুশি হতে। তাই না বাবা?
বাবা তোমাকে ছাড়া চারটি বছর কাটিয়ে দিলাম। কুরবানীর ঈদ চলে গিয়েছে চারটি, রমজানের ঈদ চলে গেছে। বিশ্বাস করো বাবা তোমাকে ছাড়া একটা ঈদে আমার আনন্দে লাগে নিই,ঈদ এলে তোমার কথা খুব মনে পরে । বাবা তোমার কি মনে পরে না আমাদের কথা?
একটি দিন ফোন দিয়ে আমাকে না পেলে তুমি পাগল হয়েছে যেতে,কিভাবে তুমি চারটি বছর আমাকে ফেলে একা কবরে শুয়ে আছে?
এমন কোরবানি ঈদের বাবা তোমার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ ছিল,তোমার খুব রক্তের প্রয়োজন ছিল, তোমার রক্ত একবারে কমে গিয়েছিল শরীরের। আমি তখন চট্টগ্রামে ছিলাম,তোমার এই খবর কেউ আমাকে শুনাই নিই, রাতের বেলা তোমার অবস্থা খুব খারাপ ছিল।আমাকে কেউ জানায়নি তুমি বলেছ বলে ,আমাকে যেন না জানাই,তোমার এই অবস্থার কথা শুনলে আমি পাগলের মতো, তোমার কাছে ছুটে আসবো বলে।
তুমি জানোনা? তুমি আমাকে না জানালে কি হবে বল,ঐদিন রাতে আমি ঘুমোতে পারিনি কেন যেন এত খারাপ লেগেছে তোমার জন্য। আবার ভয়ে এত রাতে তোমাকে ফোন দিয়ে নেই,কারণ তুমি ঘুমিয়ে থাকবে হয়তো বা তুমি বিরক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু আমি বুঝতে পারেনি কেন এত খারাপ লেগেছে তোমার জন্য, যখন সকালবেলা তোমার শরীরের অবস্থা খারাপ শুনেছি, তখন আমি বুঝতে পেরেছি খারাপটা তোমার জন্যই লেগেছে আমার।

তোমার কথা শুনে তখন আমি আর বাড়িতে থাকতে পারিনি।সবাই আমাকে বলছে আজকে কোরবানির দিন তুমি কোথায় যাবে?কোন গাড়ি পাবানা আমি বলি পায়ে হেঁটে আমি যাব আমার বাবাকে দেখতে। কিন্তু গিয়েছি বাবা তোমাকে জীবিত দেখতে পারিনি, তোমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারিনি,আমি কতখানি তোমাকে ভালোবাসি সেই কথাটি বলা হয় নিই।
এখনও এই স্মৃতিগুলো মনে হলে খুব কষ্ট লাগে। বিশেষ করে মনে হয়, কুরবানি ঈদের সময় এই কুরবানী ঈদেরসময় তুমি আমাদের একা ফেলে চলে গেছো।আমাকে একা ফেলে চলে গেছে বাবা। কেন তুমি সবাইকে বারণ করেছিলে?
আমার কাছে খবর না পৌঁছাতেই,আমি যদি আগে তোমার খবরটি শুনতে পেতাম হয়তো, তোমার সাথে একটু কথা বলতে পারতাম,তোমাকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম।
আমার পাশের যারা আত্মীয়-স্বজন আছে,ঈদে কত আনন্দ করে।সে আনন্দটা আমি করতে পারিনা। যখন আনন্দ করত চাই, যখন মন খোলে হাসতে চাই, তখন তোমার কথা বার বার মনে হয়। তোমাকে অনেক ভালোবাসি বলতে পারিনি , তুমিও তো আমাকে অনেক ভালোবেসেছো।
তুমি আমাদের জন্য নিজের জীবনটা বিসর্জন দিয়েছ।সারাদিন চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকতা,ঠিক ভাবে খাওয়া-দাওয়া করতে না,সব সময় আমাদের চিন্তা করতে। তোমার জন্য কিছু করতে পারিনি বাবা, এখনো মনে হলে খুব কান্না আসে। তোমাকে ছাড়া কিভাবে আমার ঈদ আনন্দের হয়, তুমিই ছিলে আমার খুব কাছের একটি বন্ধু।
যাদের বাবা পৃথিবীতে বেঁচে আছে তাদের এইদিনটি কতইনা আনন্দের,আর যাদের বাবা পৃথিবী থেকে চলে গেছে তাদের জন্য এই দিনটি কতইনা বেদনার তা বলে বুঝানো যাবে না।হয়তো আমার মতোই তারা তাদের বাবার অভাবটা প্রতিটা পদে পদে বুঝতে পারছে। বাবা হল একটি বট গাছ যার ছায়া তলে সন্তানের নিরাপদ স্থান।
যাদের বাবা নেই নিরাপদ স্থান পৃথিবীতে নেই।
যাদের বাবা পৃথিবীতে বেঁচে আছে,হে আল্লাহ তাদের নেক হায়াত দান করুন। যাদের বাবারা আমার বাবার মতো পৃথিবী থেকে চলে গেছে, তাদের বাবাকে আল্লাহ জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুক। (আমিন)
ধন্যবাদ, এতক্ষণ ধৈর্য ধরে আমার পোষ্টটি পড়ার জন্য।