বাবা-মায়ের অবহেলাই, সন্তানকে আত্মঘাতী করে তুলে।

in BDCommunity5 years ago (edited)

আসালামুআলাইকুম,
20210715_192140.jpghttps://picsart.com/i/305645754143201
বাবা- মায়ের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঝগড়া লেগেই থাকে।বাবা-মায়ে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে পরিবারে প্রতিনিয়ত ঝগড়া লেগেই থাকত।
প্রতিটা সন্তানের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে বাবা-মার অসচেতনতার জন্য । যখন মা–বাবার মধ্যে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের,পরিবর্তে ঘৃণা, অসম্মান, ক্ষমতা ও অবিশ্বাসের চর্চা প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে।

তখন ছেলে মেয়েরা ছোট থাকে বিধায় তা প্রতিহত করতে পারে না।যাদেরকে দেখে বড় হবে। যাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেবে। তারা যখন নিজেদের ভিতরে প্রতিহিংসার আচরণ করে। তখন সন্তানেরা নিজেকে অনেক অসহায় মনে করে।তখন সন্তানদের মধ্যে ভয়,নিরাপত্তাহীন,ক্ষোভের সৃষ্টি হয়ে থাকে যার ফলে একটা সন্তান তার ভবিষ্যতের চিন্তা ধারা ভুলে। তার বাবা-মা পরিবারের যে সমস্যাগুলো,সেগুলো সব সময় মাথায় কাজ করতে থাকে।

এরকমই ঘটেছিল সামিরের জীবনে,

সামির ছোট থেকে বাবা-মার ঝগড়াঝাঁটি দেখতে দেখতে। সে তার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সে সবসময় চিন্তা করত সব বাবা-মায়েরা মনে হয় এ রকমই হয়। আস্তে আস্তে তার মেন্টালি প্রবলেম শুরু হয়ে গেল।

সামির সারাদিন কারো সাথে কথা বলত না। তার মনে ভেতরের সব সময় হতাশা ছেয়ে থাকত। ছোটবেলা থেকে বাবা-মায়ে তেমন আদর পায়নি সামির। সারাদিন সামির বাবা-মায়ের এই অসহ্য ঝগড়াঝাটি দেখতে দেখতে বিষণ্ণতায় ভোগ ত।সামির সবসময় চিন্তা করত স্বাধীন ভাবে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারতাম যদি আমি।

তা আর হয়নি উঠেনি,সামির বেশি পড়ালেখাও করতে পারেনি পরিবারের হতাশার জন্য।সামির ছোটবেলা থেকে তার বাবার আদর তেমন পায়নি। আর কিভাবে বা পাবে? কারণ সামিরের মা-বাবার ঝগড়া যখন করত।তখন তার বাবা ঘর থেকে চলে যেত 4-5 দিন ঘরে আসতো না। এভাবে করে সামিরের বাবা-মায়ের ঝগড়ার মাত্রা আস্তে আস্তে বেরিয়ে যাচ্ছিল।

এক সময় সামিরের বাবা সামিরের মাকে ডিভোর্স দিয়ে দেয়। সেই থেকে সামির বাবার থেকে আলাদা হয়ে যায়। মায়ের কাছে থাকে, তবে বাবার অভাবটা সব সময়ই সামির অনুভব করতো। সামিরের মা সামিরকে লালন পালন করে বড় করেছে। তবে সামিরের মনের ভিতর সব সময় ক্ষোভ কাজ করত।

বাবা-মায়ের জন্য, সামির যখন বড় হল তখন সামির একটা মেয়েকে পছন্দ করতে লাগলো। কিন্তু মেয়েটা সামিরকে পছন্দ করতো না। কারণ সামিরের মানসিক সমস্যা ছিল। ওর পাড়ার মানুষের মুটামুটি জানত। তাই সামিরকে মেয়েটি এড়িয়ে চলত। সামির দেখতে সুদর্শন যুবক ছিল বটে।কিন্তু তার এই সমস্যার কারণে কেউ তাকে চান্স দিত না। কোন মেয়ে তাকে পছন্দ করত না।

কিন্তু সামির মেয়েটিকে খুব পছন্দ কর তো।তাই সামির মেয়েটিকে একটি নির্জন জায়গায় দেখা করতে বলল। মেয়েটা দেখা করতে রাজি হয়ে যায় কারণ সামিরের তো মানসিক সমস্যাও কি বুঝবে ওকে যেটা বলবো সেটাই হবে। মেয়েটি দেখা করতে এসে বলে,এই পাগল তুই কি বলবি বল,এই কথা শুনে সামিরের মাথা গরম হয়ে যায়।

সামির চেয়েছিল নিজের মত করে মেয়েটিকে পেতে। সামিরের চিন্তা করেছিল কখনো তো মা -বাবার ভালোবাসা পাইনি। হয়তো আমিই মেয়েটির ভালোবাসা পেলে আমার জীবনটা কিছুটা হলে পরিবর্তন হবে।

কিন্তু মেয়েটি তা করেনি উল্টো সামিরের সাথে বাড়াবাড়ি শুরু করে দিল।তখন সামিরের ছোটবেলা থেকে দেখে আসা স্মৃতি মনে হল। তার মা-বাবার কথা না শুনলে বাবা যেরকম করে মাকে মারধর করত।সেই কথা মনে করে মেয়েটিকে প্রচন্ড রকমের মারধর করেছে। তখনো বুঝেনি সামির মেয়েটি তার মার সহ্য করতে পারবেনা।সামিরের প্রচণ্ড আঘাতে এক সময় মেয়েটি মারা যায়।

মেয়েটি মারা গেছে বুঝতে পেরে সামির ওই স্থান থেকে পলায়ন করল। পুলিশ এসে মেয়েটির লাশ পুলিশ এ নিয়ে অনেক তদন্ত করল।অনেক মানুষকে ধরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করল কিন্তু মেয়েটিকে কে খুন করেছে সে হদিশ পুলিশে পায়নি। কিন্তুু সামিরে ব্যাপারে কারো মনে বিন্দু পরিমান সন্দেহ ছিল না।কারণ সবাই জানত সামির একটু মেন্টালিটি সমস্যা আছে তাই ওকে কেউ সন্দেহ করেনি।

তবে মেয়েটিকে মারার পর সামিরের মনে বিন্দু পরিমান অনুশোচনা ছিল না। কারণ সামির এসব সহ্য করতে করতে তার জীবনের অর্ধেকটা সময় পার করে দিয়েছে।সামির তার মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করত না সবসময় সে রাগান্বিত অবস্থায় থাকতো। সামির তেমন মানুষের সাথে মেলামেশা করতো না। সবসময় একা একা থাকতে পছন্দ করত।

সামির যখন কোন পুরুষ মানুষকে দেখতো তখন বাবা বলে সম্মোধন করত। কিন্তু সামির কখনো চিন্তাও করেনি তার সত্যিকারে বাবা টিকে তার সামনে দেখতে পাবে। স্বামীর বাবাকে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে। বলে বাবা তুমি আমাকে চিনতে পেরেছ?আমি তোমার সামির তার বাবা তার চেহারার দিকে তাকিয়ে বলে। তুই কে আমি তোকে চিনি না।বাড়ি থেকে বের হয়ে যা,আর নাহলে আমি দারোয়ান দিয়ে তোকে বাড়ি থেকে বের করে দিব।

সামির সব সময় বাবা কে পছন্দ করত।বাবার অভাব অনুভব করতো কিন্তু সেই বাবা তাকে সন্তান বলে স্বীকার করতে রাজি হয়নি। তারপরও সামির তার বাবার বাসার সামনে রাস্তায় বসে থাকতো। কখন বাবা ঘর থেকে বের হবে তার বাবার সাথে একটু কথা বলার সুযোগ পাবে।

সামিরের বাবা সামির কে দেখলে রাগান্বিত হয়ে যেত। সামির সব সময় মনে করত তার বাবা তাকে প্রচন্ড ভালোবাসতো। কিন্তু সামিরের এই ধারণাটা মোটেই সত্যি ছিল না।কারণ সামিরের বাবা সামিরের মাকে যেমন পছন্দ করত সামীরকে তেমনি অপছন্দ করত। সামির চেয়েছিল তার বাবাকে অনেকবার বলতে বাবা আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

কিন্তু সামিরের বাবা তাকে মোটেও পাত্তা দিচ্ছে না বরঞ্চ সামিরকে বকাঝকা করত,ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিত। তখন সামিরের মনে আরো কষ্ট খুব বেড়ে যায়। এই ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় সামির তার বাবাকে খুন করে ফেলবে।তখন চিন্তা করে কিভাবে বাবাকে খুন করা যায়।

সামির চলাফেরা করত খারাপ ছেলেদের সাথে। ছেলেদের সাথে বিভিন্ন রকমের অস্ত্রপাতি থাকতো। যখন সে এইসব কথা বন্ধুদের বলত তখন বন্ধুরা তাকে অনেক ক্ষেপিয়ে দিত। তো তখন সামিরের মনে আরো ক্ষোভ জন্মাতে থাকত তার বাবা-মায়ের প্রতি। আর এদিক দিয়ে সামিরের এই ক্ষোভ আর যন্ত্রণা দেখে বকাটে বন্ধুগুলো দূর থেকে দেখে অনেক মজা করত।

বখাটে বন্ধুদের সহযোগিতা নিয়ে। একদিন সকালবেলা তার বাবা ঘর থেকে বের হচ্ছে এরকম সময় বাবাকে গুলি করে হত্যা করে সামির। তার বাবাকে গুলি করার সময় অনেকে দেখে ফেলে। তখন পুলিশ এসে সামির কে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সামির তার সব কথা পুলিশকে খুলে বলে। তার এই অবস্থার জন্য তার বাবা-মায়ের দায়ী।

আর মেয়েটিকে যে খুন করেছে সে কথাও স্বীকার করেছে । সামির শুধু বারবার পুলিশকে বলছে আমার এই পরিস্থিতির জন্য আমার পরিবার,আমার বাবা-মা দায়ি তাদেরকে আগে শাস্তি দেওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু আমার বাবাকে আমি নিজেই শাস্তি দিয়েছি।আমি আমার বাবাকে হত্যা করেছে।

পরিবারের অবহেলার কারণে আজকে আমি বিষন্নতায় ভুগছি। আমার মানসিক সমস্যার জন্য আমার পরিবার দায়ি। আজকে আমার এই পরিবারের জন্য আমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেছে।একটা পরিবারের বাবা-মায়ের অবহেলার জন্য একটা সন্তানের ভবিষ্যত নষ্ট হতে সময় লাগে না ।

আমাদের সমাজে সামিরের মত অনেক সন্তান আছে।যারা পারিবারিক কলহের কারণে, বাবা-মায়ের ঝগড়া বিবাদের ফলে সন্তানদের মস্তিষ্কে বিষন্নতা,ক্ষোভ সৃষ্টি হয়ে থাকে। যা থেকে তাদের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে তখন একটা মানুষকে খুন করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

সামিরের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে, অনেকদিনের ক্ষোভে তার বাবাকে খুন করে সে ক্ষোভ টা মিটিয়েছিল। আসলে সামির যদি পরিবারের আদর, যত্ন পেত। বাবা-মায়ের অবহেলা না পেত তাহলে সামির এরকম হত না।

আমাদের প্রতিটা বাবা-মায়ের দরকার তার সন্তানের ভবিষ্যতের চিন্তা করে।আমাদের সন্তানদের সামনে আমাদের যত সমস্যা হোক না কেন। সেই সমস্যাগুলো সন্তানদের সামনে প্রকাশ না করা।

তা না তাহলে সামিরের এর মত
আমাদের সন্তানেরা আত্মঘাতী সন্তান হিসেবে বেরে উঠবে।
সেই দিকে প্রতিটা মা-বাবার খেয়াল রাখতে হবে।

ধন্যবাদ, আমার লেখাটা এতক্ষণ পড়ার জন্য।