শুরুটা হয়েছিলো ২৫ মার্চ রাতেই। মগবাজারে কাজী কামাল, আজাদ, সৈয়দ আশরাফুল এবং আরো বেশ কয়েকজন পিকেটিং করছিলো, ব্যারিকেড দিচ্ছিলো। হাবিবুল আলমও ছিলেন মগবাজার মোড়ে, সাথে ছিলেন শেখ কামাল। আর সবার সাথে ছিলো জনতা; ছাত্র-যুবক-শ্রমিক। সবার হাতেই বাঁশের লাঠি, রড। রাত আরো গভীর হলে রাস্তায় নামে ট্যাংক-বুলডোজার। আকাশ জ্বলে ওঠে ট্রেসার হাউই, মাটিতে চলে মেশিনগান, মর্টার আর রিকোয়েললেস রাইফেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, রাজারবাগের পুলিশ লাইন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, পুলিশ স্টেশন, ইপিআর ব্যারাক, ফয়ার সার্ভিস অফিস- সব জায়গায় পড়ে আছে লাশ আর লাশ। ২৬ মার্চ রেডিওর নব ঘোরালে রেডিও পাকিস্তানে বেজে ওঠে সামরিক বিধি-নিষেধ। আর আকাশবানীর ইংরেজি খবরে বলা হয়, “ওয়েস্ট পাকিস্তান হ্যাজ অ্যাটাকড ইস্ট পাকিস্তান। ”
২৭ মার্চ কারফিউ উঠিয়ে নেওয়ার পর ঢাকাবাসী ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে পাকিস্তান আর্মি আসলে কোন জাহান্নাম প্রতিষ্ঠা করেছে। কারফিউ বিরতিতে অনেক পুলিশ পালিয়ে যায় মুক্তিফৌজের খোঁজে। আজাদদের বাসা হয়ে পালিয়ে যায় তার সেন্ট গ্রেগরির বন্ধু ক্যাপ্টেন সালেক চৌধুরি এবং ক্যাপ্টেন মাহমুদ। জাহানারা ইমাম তাঁর ছেলে রুমীকে নিয়ে বেরিয়ে দেখতে পান নিউমার্কেটে সবজিবাজারের সাথে সাথে মানুষও পুড়ছে। এমন সময় সংঘটিত হতে শুরু করে ঢাকার যুবকেরা, যারাই পরবর্তীতে পরিনত হয়েছিলো কিংবদন্তীতে, ‘দ্যা আরবান গেরিলা গ্যাং’। শহীদুল্লাহ খান বাদল, বদিউল আলম, আসফাকুস সামাদ আশফি এবং মাসুদ ওমর বেরিয়ে পড়ে বাঙালী ফোর্সের খোঁজে, পা বাড়ায় ময়মনসিংহের পথে। শাহাদত চৌধুরি আর ফতেহ চৌধুরিও বেরিয়ে পড়ে। গাজীপুরে সেকেন্ড বেঙ্গল, চট্টগ্রামে এইটথ বেঙ্গল এবং ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় ফোর্থ বেঙ্গল বিদ্রোহ করে। কাজী কামালও মেলাঘর চলে যায় ফতেহ চৌধুরির সাথে। রুমীও বাড়ি ছাড়ে আমেরিকার আইআইটির হাতছানি ছেড়ে। হাবিবুল আলম পাশবালিশ শুইয়ে রেখে চলে যান অজানার উদ্দেশ্যে। খালেদ মোশাররফ রিভোল্ট করেন ফোর্থ বেঙ্গল নিয়ে, ক্যাপ্টেন হায়দার আহমেদ জিয়াকে সেক্টর টু থেকে পাঠিয়ে দেন ঢাকায়, তরুনদের স্কাউট করার জন্য।

Image source
একের পর এক ট্রেনিং নেওয়া গেরিলা আসতে থাকে ঢাকায়। ফার্মগেটের বিরানব্বই সেকেন্ডের অপারেশনে মারা যায় ১২ জন মিলিটারি। ঢাকার বুকে বিভিন্ন হাইডআউটে মিটিং হয়, রাস্তাঘাটে পাকিস্তানী মিলিটারির সামনে অশনি সংকেতের মতো উদয় হয় ক্র্যাক প্লাটুন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, ঢাকার চারটা পাওয়ার স্টেশন এবং জায়গায় জায়গায় মিলিটারি টেন্টগুলো টার্গেট করে গেরিলারা। ক্যাপ্টেন হায়দার যে তাঁদের নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন, “গেরিলারা কিন্তু পাকিস্তান মিলিটারির সাথে সরাসরি যুদ্ধ করবে না, তারা হঠাৎ আক্রমন করবে, লুকিয়ে যাবে জনারন্যে ”। সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে রেকি করতে গিয়ে রামপুরা বিলে সরাসরি সংঘাত হয় পাকিস্তানী মিলিটারীর সাথে, তারা আর বেশিদূর এগোতে পারে না। পিরুলিয়া হাইডআউট হয়ে ফিরে আসে। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন টেকে না। গেরিলাদের দুঃসাহসিক অভিযানে পাকিস্তানি মিলিটারি ব্যাপকভাবে ক্ষেপে ওঠে। সমগ্র ঢাকায় তাদের ইনফর্মার, ইন্টিলিজেন্সের লোকজন ছড়িয়ে দেয়, চিরুনি অভিযান শুরু করে ক্র্যাক প্লাটুনের বিরুদ্ধে। একে একে ধরা পড়তে থাকে ঢাকার গেরিলারা। ২৯ আগস্ট ধরা পড়ে রুমী, জামী ও তাদের বাবা শরীফ ইমাম। আরোও ধরা পড়ে বদি, সামাদ। ৩৯ মগবাজার, হাজী মনিরুদ্দিন ভিলা থেকে ধরা পড়ে আজাদ, জুয়েল, বাশার। মেজর সরফরাজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে স্টেন নিয়ে ধস্তাধস্তি করে জন্মদিনের পোশাকে পালিয়ে যায় কাজী কামাল। আলমদের বাসা রেইড করে মিলিটারি, রান্নাঘরের মেঝের গোপন কুঠুরি থেকে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হয়। মিউজিক ডিরেক্টর আলতাফ মাহমুদের বাসায় এসে চার্জ করতে থাকে, “ হয়্যার আর দি আর্মস অ্যান্ড অ্যামুনিশনস?” আলতাফ মাহমুদ সব দোষ নিজের ঘাড়ে তুলে নেন, ফলে বেঁচে যান গেরিলা আবুল বারক আলভী। একই রাতে পাকিস্তানী আর্মি হানা দেয় ২১টা বাড়িতে। সবাইকে নিয়ে যায় তেজগাঁও এয়ারপোর্টের উল্টেদিকে এমপি হোস্টেলে, করা হয় অমানুষিক নির্যাতন। হাতের নখ উপড়ে ফেলা হয়, হাত ভেঙ্গে ফেলা হয়। মারতে মারতে শরীর ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে একেকজনের, তবু কেউ দেশের সঙ্গে বেইমানি করে না। শেষপর্যন্ত চূড়ান্ত শাস্তির নির্দেশ দিলে টর্চারের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনায় আশ্বস্ত হয়ে ওঠে।

ক্র্যাক প্লাটুন
Image source
একদল ধরা পড়ে যায়, কিন্তু আরোও দল জেগে উঠতে থাকে ঢাকার বুকে। মেলাঘরে মুক্তিযোদ্ধারা নতুন করে পরিকল্পনা আঁটতে থাকে। কাদের সিদ্দীকী, হেমায়েত, মাহবুব আলমসহ ইপিআর, পুলিশ এবং বাঙ্গালীর রেগুলার মুক্তিফৌজের আক্রমনে দিশেহারা হয়ে পড়তে থাকে পাকিস্তানী মিলিটারী, একের পর এক ভূমি স্বাধীন হতে থাকে। খালেদ মোশাররফ যুদ্ধাহত হলেও থেমে থাকে না যুদ্ধের গতি, বরং তা আরো বাড়তেই থাকে। নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু আরো গেরিলা নিয়ে আসেন ঢাকায়, মেজর হায়দারের গায়ে কমান্ডো পোশাক-এবার ফাইনাল আঘাত, ঢাকা দখল। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন হয় দেশ। সবাই একই সাথে হাসছে এবং কাঁদছে, স্বাধীনতার হাসি আর স্বজন হারানোর বেদনা। কাঙ্খিত স্বাধীনতা অর্জিত হয়, কিন্তু ফেরে না জুয়েল, বদি, রুমী, আজাদ,সামাদ,আলতাফ মাহমুদসহ আরো অনেকে, ঠিক যেমনটি খালেদ মোশাররফ বলতেন, “স্বাধীন দেশের সরকার জীবিত গেরিলাদের চায় না,যদি তোমরা শহীদ হও সেটা হবে তোমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবহার, সেটা হবে বীরের মৃত্যু। ”

মেজর খালেদ মোশাররফ
Image source
তথ্যসূত্র-
১.মা-আনিসুল হক
২.একাত্তরের দিনগুলি-জাহানারা ইমাম
৩.Major Khaled’s War- Documentary.

Congratulations @tahmidtwelve! You have completed the following achievement on the Hive blockchain and have been rewarded with new badge(s) :
Your next target is to reach 20 posts.
You can view your badges on your board and compare yourself to others in the Ranking
If you no longer want to receive notifications, reply to this comment with the word
STOPTo support your work, I also upvoted your post!