দাদির হাতের নকশিকাঁথা।😌🦚

in BDCommunity2 months ago

ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, আমার দাদি খুব নিখুঁতভাবে ও সুন্দর করে নকশিকাঁথা সেলাই করতেন। দেখতে সত্যিই খুব ভালো লাগত। আমার দাদি এখনো এসব কাজ খুব সুন্দরভাবে করতে পারেন। দাদির হাতের কাজে এক ধরনের মায়া ও যত্ন থাকে, যা দেখলে মন ভরে যায়। তার তৈরি নকশিকাঁথা দেখতে এখনো ভীষণ সুন্দর লাগে।

A181DF2D-8C6D-4E51-A2FE-408AE3D8850F.jpeg

নকশিকাঁথা শুধু শীত নিবারণের জিনিস নয়, এটি এখনো পরিবারের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকে। দাদির হাতের নকশিকাঁথা আমাদের পরিশ্রম, ধৈর্য আর সৃষ্টিশীলতার মূল্য শেখায়। আধুনিকতার ভিড়েও এই নকশিকাঁথা বাঙালি সংস্কৃতির গর্ব হিসেবে আজও টিকে আছে।

দাদির হাতের নকশিকাঁথা আমার কাছে এক নীরব গল্পের মতো। তিনি কথা কম বললেও তার সেলাইয়ের ভাষা ছিল অনেক গভীর। প্রতিটি নকশায় যেন দাদির জীবনের অভিজ্ঞতা, সুখ-দুঃখ আর প্রার্থনার ছাপ লুকিয়ে থাকত। সকাল কিংবা বিকেলে উঠোনে বসে ধীরে ধীরে সেলাই করতে করতে তিনি যেন সময়কে থামিয়ে দিতেন।

আজও যখন দাদিকে নকশিকাঁথা সেলাই করতে দেখি, মনে হয় এই শিল্প শুধু হাতে নয়, হৃদয় দিয়ে তৈরি। আধুনিক জিনিসের ভিড়েও দাদির নকশিকাঁথা আলাদা করে চোখে পড়ে, কারণ এতে মেশিনের নয়—মানুষের স্পর্শ থাকে। দাদির হাতের এই কাজ আমাদের শেখায়, ভালোবাসা আর ধৈর্য দিয়ে তৈরি জিনিস কখনো পুরোনো হয় না।

IMG_3405.jpeg

IMG_3404.jpeg

নকশিকাঁথা বাংলার লোকজ শিল্পের এক অমূল্য ঐতিহ্য। এটি সাধারণত পুরোনো শাড়ি, ধুতি বা কাপড়ের স্তর জোড়া দিয়ে হাতে সেলাই করে তৈরি করা হয়। রঙিন সুতো দিয়ে করা নানান নকশা—ফুল, লতা, পাখি, মাছ, সূর্য কিংবা গ্রামীণ জীবনের দৃশ্য—নকশিকাঁথাকে করে তোলে অনন্য ও জীবন্ত। প্রতিটি নকশার পেছনে থাকে সেলাইকারীর কল্পনা, অনুভূতি আর জীবনের গল্প।

নকশিকাঁথা শুধু ব্যবহারিক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ ও সংস্কৃতি। শিশুর ঘুম পাড়ানো, শীতে গা ঢাকা দেওয়া, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা স্মৃতি হিসেবে উপহার—সবক্ষেত্রেই নকশিকাঁথার ব্যবহার দেখা যায়। একসময় মায়েরা ও দাদিরা পরিবারের জন্য ভালোবাসা দিয়ে নকশিকাঁথা বানাতেন। আজও নকশিকাঁথা আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয় এবং বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে চলেছে।

IMG_3407.jpeg

IMG_3409.jpeg

নকশিকাঁথা শুধু একটি হাতের কাজ নয়, এটি বাংলার নারীদের অনুভূতি ও সৃজনশীলতার প্রকাশ। দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে সেলাই করতে করতে নারীরা তাদের আশা, স্বপ্ন, আনন্দ আর বেদনার কথা নকশার ভেতর তুলে ধরতেন। অনেক নকশিকাঁথায় জীবনের গল্প, প্রকৃতি, ধর্মীয় প্রতীক কিংবা সংসারের ছোট ছোট মুহূর্ত ফুটে ওঠে। তাই প্রতিটি নকশিকাঁথা আলাদা, একটিও আরেকটির মতো নয়।

গ্রামবাংলায় নকশিকাঁথা ছিল মায়ের ভালোবাসার চাদর। শিশুকে জড়িয়ে ধরা, অসুস্থ মানুষকে উষ্ণতা দেওয়া কিংবা প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার মাধ্যমে এই কাঁথা হয়ে উঠত আবেগের বাহন। আজ আধুনিক কম্বলের ভিড়েও নকশিকাঁথার গুরুত্ব কমেনি। এটি এখন শুধু ব্যবহার্য জিনিস নয়, বরং শিল্পকর্ম ও ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে দেশে-বিদেশে সমাদৃত হচ্ছে।

IMG_3229.jpeg

নকশিকাঁথার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সময়, ধৈর্য আর ভালোবাসার গল্প। একটি নকশিকাঁথা তৈরি করতে অনেক দিন, কখনো কখনো মাসও লেগে যায়। প্রতিদিন অল্প অল্প করে সেলাই করতে করতে কাঁথার ওপর নকশা ফুটে ওঠে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াই নকশিকাঁথাকে বিশেষ করে তোলে, কারণ এতে তাড়াহুড়ার কোনো জায়গা নেই—শুধু যত্ন আর মনোযোগ।

নকশিকাঁথা আমাদের পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনেরও এক সুন্দর উদাহরণ। পুরোনো কাপড় পুনঃব্যবহার করে নতুন কিছু তৈরি করার মাধ্যমে অপচয় কমানো হয়। এভাবে নকশিকাঁথা আমাদের শিখিয়ে দেয় সঞ্চয়, সৃজনশীলতা আর প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ। আজও দাদির হাতের নকশিকাঁথা দেখে বোঝা যায়—সরল উপকরণ আর আন্তরিক শ্রম দিয়ে কত সুন্দর শিল্প সৃষ্টি করা যায়।

IMG_3403.jpeg