পথের পাঁচালী(১৯৫৫) | একটি দারিদ্র্য পরিবারের টিকে থাকার গল্প।

in BDCommunity5 years ago (edited)

image

images (11).jpeg

পরিবার, দারিদ্র, ভালোবাসা, জীবন সংগ্রাম সবকিছুই আমাদের নিত্যদিনের জীবন সঙ্গী এবং এই সবগুলোর অনুভূতির পেয়েছি আমি “পথের পাঁচালী” চলচ্চিত্রটি দেখে। ছবির আগে পথের পাঁচালী এটি একটি সাহিত্যিক উপন্যাস। আমি যখন পথের পাঁচালী দেখা শুরু করি আমার প্রথমে যেটা মন কেরে ছিল সেটা হল দুর্গা চরিত্রের যেই মেয়েটি অভিনয় করেছে তার ছোটবেলার সেই জীবন চিত্র। তার শৈশবকালের জীবন চিত্র দেখে নিজের জীবনের ছোটবেলার সেই সোনালী দিনগুলো মনে পড়ে গেছে। আমিও কিন্তু ছোটবেলায় দুর্গার মতই বাইরে খুব ঘুরে বেড়াতাম। খেলার ছলে বাড়ি থেকে বের হলে আর যেন বাড়ি ফিরতে মন চাইত না। মা আমার পিছনে পিছনে ছুটতো বাড়ি ফিরিয়ে আনতে।

কিন্তু খেলায় ডুবে থেকে কিছুতেই বাসায় আসতে ইচ্ছে করতো না, এর জন্য মায়ের হাতে মার ও কম খাইনি। দুর্গার মত আমিও ফিরে গিয়েছিলাম আমার সেই সোনালি শৈশবে। আরেকটা জিনিস কিন্তু খুব মনে ধরেছে, ছোট বেলায় সেই পিকনিকের কথা। দুর্গার বান্ধবীদের সাথে পিকনিক করে। আমার ও ছোট বেলার কথা মনে পড়ে যায়। আমার এখনো মনে আছে আমাদের এখানেও প্রতি রোজার ঈদের পরে আমরা সব বান্ধবীরা মিলে পিকনিক করতাম। কিন্তু যতই বড় হয়েছি ততই যেন এই আনন্দের সময় গুলো পিছনে ফেলে আসছি।

দূর্গা বেশ চঞ্চল একটা মেয়ে সারাদিন এখান থেকে ওখানে ছুটে বেড়ায়। কারো গাছের ফল যেন তার দরুন গাছে থাকে না। এ নিয়ে দুর্গার মা সর্বজয়াকে পাড়াপ্রতিবেশির নানান কটুকথা শুনতে হয়। অবুঝ মেয়ে যেটা ভালো লাগে সেটাই কে বেড়ায়। দূর্গার মতো এমন জীবন চিত্র আমরা আমাদের গ্রামাঞ্চলে দেখতে পাই। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় পরিবার গুলোর দিকে তাকলে ঠিক একই চিত্র দেখতে পাবো। বেঁচে থাকার সংগ্রামী পরিবার গুলোর কাছে সন্তানগুলোই একমাত্র সম্বল।

আমার কাছে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর সম্পর্ক হচ্ছে ভাইবোনের সম্পর্ক। যেটা আমরা এখানে দেখতে পাই, দুর্গা এবং অপুকে দেখলেই বুঝতে পারব তাদের সম্পর্ক কত মধুর। দুই ভাইবোনের মধ্যে কতটা ভালোবাসা, ঝগড়া, খুনসুটি সবকিছুই ভাইবোনের সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে। দুর্গা এবং অপু কান পেতে রেলগাড়ির শব্দ শুনছে। কাশফুলের মাঝে ছুটে চলছে রেলগাড়ি। আকাশে ভেসে যাচ্ছে সাদা মেঘ একই সাথে অপু এবং দুর্গা ছুটে চলছে। দৃশ্যটা কিন্তু বেশ সুন্দর ছোটবেলার এই দুরন্তপনা এগুলো আমাদের জীবনের মূল্যবান সম্পদ। পুরনো বাংলার অপু এবং দুর্গার ভালোবাসা খুব সুন্দর ভাবে এখানে আমার চোখে ভেসে উঠেছে।

দুর্গার সেই পুতুলের বাক্স সবকিছুই যেন আমাদের ছেলেবেলার একেকটা সুন্দর স্মৃতি ফুটিয়ে তুলেছেন। বৃষ্টিতে ভেজা আম কুড়ানো এগুলো এখন আর কিছুই নেই কিন্তু পথের পাঁচালীতে দেখে সবকিছুই মনে হয়েছে আমি নিজের মধ্যে উপলব্ধি করছি। আমি খুব ছোট থাকতেই আমার নানু মারা যায়।কিন্তু যখনই আমি গ্রামে যেতাম আর নানুর সাথে দেখা হতো। তখনই খুব খেয়াল করতাম নানু আমাদের মতই বাচ্চাদের জিনিস খেতে খুব পছন্দ করত। যেমন বরইয়ের আচার, পেয়ারা, চকলেট এসব পেলেই সে খুব খুশি হত। ভাবছেন তো যে কেন হঠাৎ তার কথা বললাম। দুর্গার পিসিকে যখন দেখলাম এমনিতেই নিজের নানুর কথা মনে পড়ে গেল। দুর্গা যেভাবে নিজের বিশেষ জন্য কলাম পেঁপে এগুলো এনে দিত আসছি কিন্তু বেশ খুশি হত। বৃদ্ধ মানুষ গুলোই যেন বাচ্চাদের মত আচরণ করে।

কিন্তু দুর্গার পিসির সাথে দুর্গার মায়ের একদমই মিলত না। কারণ দুর্গা সবসময়ই পেয়ারা চুরি করে তার পিসিকে এনে দিত। এবং দুর্গা সব সময় ধরা পড়ে যেত যার কারণে দুর্গার মা সর্বজয়াকে নানান কটুকথা শুনতে হতো। এজন্য দুর্গাকে সব সময় মায়ের কাছে বকা শুনতে হত। যার কারণে পিসিকে একদমই সহ্য করতে পারত না। মাঝে মধ্যেই দুর্গার মায়ের সাথে ঝগড়া হলে পিসি বাড়ি ছেড়ে দিত। এভাবেই একদিন পিসি বাড়ি ছেড়ে গিয়ে আর ফিরল না চির বিদায় নিল জীবন থেকে।

দারিদ্রতা, কেউ বলে দারিদ্রতা নাকি জীবনের সবথেকে বড় অভিশাপ। কারণ এটা বারবারই প্রমাণ করে গেছে। তেমনি দুর্গার পরিবার ছিল খুবই গরীব। দুর্গার বাবা হরিহর মানুষ হিসেবে খুবই ভালো ছিল। যার কারণে যে যেদিকে পারত তাকে ঠকিয়ে যেত। যার কারণে দুর্গার পরিবারের অভাব বেড়ে চলত। হরিহরের শেষ চাকরিতে চার মাসের বেতন না দিয়েই তাকে চাকরি থেকে বের করে দেয়। সংসারে টানাটানি লেগেই থাকে ভালো খাবার নেই ভালো কাপড় নেই। কিন্তু দুর্গা ছিল তার পুরোটাই উল্টো। সে কোন কিছুতেই পাত্তা দিত না সে নিজের মতো করেই বনে বনে সারাক্ষণ ছুটে চলতো। দুর্গার বাবা হরিহর বিভিন্ন জায়গায় চাকরির চেষ্টা করে। এবং একটি চাকরিও পেয়ে যায় যেখানে মাসে 8 টাকা বেতন দেয় কিছুদিন ভালই চলছিল। কিন্তু মানিকের জমিজমার ফ্যাসাদে তিন মাস বেতন পায় না শেষে ২৪ টাকা বেতন পায় সেটা দিয়ে নিজের সংসার চালায় এবং মানুষের ঋণ পরিশোধ করে।

হরিহর ছিল জাতে পুরোহিত। তার থেকে অনেকে মন্ত্র কিনতে চাইতো। সেই সুবাদে সে মন্ত্র বিক্রি করার জন্য শহরে যায়। কিন্তু খরিদ্দার সুবিধা না হওয়ার কারণে সে আর মন্ত্র বিক্রি করে না। হরিহার বাড়িতে চিঠি পাঠায় সে কিছুদিনের মধ্যে বাড়ি ফিরে আসবে। কিন্তু দিনজা বছর যায় হরি আর ফিরে আসে না। যার কারণে দুর্গার পরিবারে আরো অভাব বেশি হয়। সে চাকরি পেয়েছে এই মাসেই সে ফিরে আসবে। পরিবার সবাই খুবই খুশি। দুইদিন ধরে বৃষ্টি হয় অপু আর দুর্গার ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে। অপুর কিছু না হলেও দুর্গার প্রচন্ড জ্বর চলে আসে। এরমধ্যে আবার রাত্রে প্রচুর ঝড় চলে আসে। দুর্গার বাড়ি দরজা জানালা ভেঙে যায় রাত পোহাতে পোহাতে দুর্গা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দূর্গা চরিত্রটি অতি ছিলো ক্ষণস্থায়ী ,সেতো ঠিক করে বেড়ে উঠতেই পারেনি। ম্যালেরিয়া জ্বর শেষ পর্যায়ে এসে দুর্গাকে কেড়ে নেয় পরিবার থেকে।

এই দৃশ্যে এসে দুর্গার জন্য আমার বেশ খারাপ লাগে। যে দুর্গা সারা বাড়ি আনন্দে মেতে রাখত সেই দুর্গা এভাবে চলে গেল। সুখের দিন আসতে মাত্র আর কিছুদিন বাকি ছিল। কিন্তু দূর্গা সেটা উপলব্ধি না করতে পেরে সবার মায়া ত্যাগ করে চলে গেল। তারপরেই দুর্গার বাবা হরিহর বাড়ি ফিরে আসে। যা যা দরকার ছিল সব কিছু কিনে আনে। দুর্গার জন্য সুন্দর একটি শাড়ি কিনে আনে। কিন্তু দূর্গাই ছিল না। এতোসব কিছুর পর হরিহর নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে কাশিতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। গরুর গাড়িতে যাওয়ার সময় তিন জনের চোখেই জল ছিল সেই চতুর্থ মানুষটির জন্য।

আমার উপলব্ধি আমার ব্যাখ্যা সবকিছুই পথের পাঁচালীর কাছে খুবই নগণ্য। এটা আমাদের প্রতিদিনের বাস্তব জীবনের চিত্র। যেখানে আমাদের প্রতিদিন কিছু না কিছু কাছে করে দেবে। তাও আমরা আশায় বেঁচে থাকি শুধু একটি ভালো দিনের আশায় বেঁচে আছি।