রক্তদানে ভালোবাসা ও বিড়ম্বনা

in BDCommunity5 years ago

একটি বিষয়ে আমি কখনো আগে পিছে সাথে পাঁচে কিছুই ভাবি না। যথা সাধ্য চেষ্টা করি সময় সুযোগ বার করতে। কোন অজুহাতেই খুঁজি না। ভিতর থেকে অটোমেটিক হ্যাঁ চলে আসে। যে জিনিসটা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিয়ে দিয়েছে সেটা দিয়ে অন্যকে সাহায্য করতে আমার কিসের সমস্যা থাকতে পারে। অনেকেই এই করোনার সময় ক্লিনিক বা ম্যাডিকেল গুলোতে ভয়ে যাচ্ছে না আবার রক্ত দিতে তো আরো না। অনেকেই মনে করে নিজের খায়ে বোনের মহিষ তারাতে গিয়ে করোনার স্বীকার হওয়ার কি দরকার। আমি আবার ভাবি, মৃত্যুর বা করোনার ভয়ে একটা লোককে তো আর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারি না। করণ বিপদ যে কোন সময় আমাকেও তারা করতে পারে। কোন মুভিতে একটা ডায়ালগ শুনেছিলাম- " হামে মোওত সে ভাগনা নেহি চাইয়ে, মোওত হামে কাভিবি ঢুন সাকতা হ্যায়। "

১৩ বারের মত এবার রক্ত দিয়ে আসলাম। আমার কাছে এটা খুব আনন্দ লাগে। এই রক্তের প্রয়োজনে কোন ফোন আসলে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করি তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। যেহেতু আমার রক্তের গ্রুপ "এ নেগেটিভ" তাই খুব বেশিই ফোন আসে রক্তের প্রয়োজনে। চার মাসের মধ্যে যাদের ফোন আসে তাদের দিতে পারি না বলে খারাপ ও লাগে।

কাল রাতে এক ছোট ভাই মেসেঞ্জারে নক দিয়েছিল এক বাবার রক্ত প্রয়োজন। কখন কোথায় লাগবে এই কথায় শুধু শুনতে চেয়েছিলাম।

কাল রাতের কথা অনুযায়ী রোগীর জামাই বিকাল চারটায় ফোন দিয়েছে তিনি আমার অপেক্ষা করছে রংপুরে লাইফ লাইন ক্লিনিকে রুগী আছে সেখানে নিয়ে যাবে। সেখানেই রক্ত লাগবে। অফিসে কাজ ছিল আবার আমার সেন্টারেও কাজ ছিল। অফিস শেষ করে সেন্টারে কাজ করতেই চারটা বাজে গেছে তাই লাঞ্চ করতে পারি নিই। এরেই মধ্যে ওনার ফোন। রিসিভ করে শুনে নিলাম উনি আছে পাঁচ মাথা মোড়ে। আমি ওনাকে সেখানেই থাকতে বলে হোটেলে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলাম। পরে ওনাকে ফোন দিয়ে একসাথে রওনা দিলাম। লক ডাউনের কারনে গাড়ি বন্ধ তাই একটা কার লোকাল যাত্রীদের নিয়ে যাচ্ছে। সেই কারে করেই রংপুরে আসলাম।

20210412_183539.jpg

যথা নিয়মে লাল ভালোবাসা দিয়ে রোগীর সাথে দেখা করি। যায়ে দেখি আমার অফিসের পাশেই অর্নেট বিউটি পার্লারের পপির বাবার জন্যই রক্ত লাগবে। যাই হোক বিদায় নিয়ে আসার সময় আমার হাতে একটা ব্যাগ ধরায় দিচ্ছে। ব্যাগের মধ্যে অনেক ফলমুল। বেদনা, আপেল, আঙ্গুর, কমলা। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো এইসব রোগীর জন্যই নিয়ে যাচ্ছে। পরে উনি আমাকে বললো এইসব আপনার জন্য। আমি পুরাই অবাক। এতবার রক্ত দিয়েছি এই রকম কেউ করে নিই। তবে আমি যেহেতু অনেক সময় নিজের টাকা খরচ করেই রক্ত দিতে যাই সেখানে এইসব ফলগুলো নেওয়ার প্রশ্নই আসে না । আমি অবশেষে ফলগুলো রুগীকে খাওয়ানোর জন্যই রেখে দিতে বললাম। আমার কাছে এতোগুলো ফলমূল নেওয়াটা মনে হচ্ছিল রক্তের বিনিময়ে যদিও বা ওনারা সেই উদ্দেশ্যে দেয় নিই তারপরেও।

আসলেই অনেকের কাছে অনেক সময় শুনি যে রক্ত দিতে গিয়ে ভালো ব্যবহার করে না। বিভিন্ন হয়রানির স্বীকার হয়েছে। রুগীর লোকদের নামে বিভিন্ন অভিযোগ করে। কিন্তু আমার সাথে কখনোই এমনটা হয় নিই। সব সময় রুগীর পরিবারের লোকের কাছে ভালো ব্যবহারেই পাই।

আসার সময় অটো সিএনজিতে চাপাচাপি করে বসেই আসতে হল। আর এই চাপাচাপিতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরে যাই। কোভিড-19 হয়তো ভাবছে কোন জায়গায় আসলাম। এরা তো থোরাই ভয় করছে না আমাকে। অতিরিক্ত ধূলা বালি আর আমার সাইনোসাইডের সমস্যার কারনে খুবই হাঁচি আর কাশি শুরু হলে থামতেই চায় না। বাজি ধরে টানা দশবার হাঁচি দিতে পারবো। যাই হোক সিএনজিতে উঠেই কিছুক্ষন পর গলার ভিতরে শুশশুরি উঠছে। খুশখুশি কাশ হবে। পরিস্থিতি তো খুবই খারাপ। যথা সাধ্য চেষ্টা করছি যাতে চাপে রাখা যায়। কিন্তু কাশি কি আর আটকে রাখা যায়? সব বাধা আর মানিজ্জতের গুল্লি মারে বার হয়ে গেলো কাশি। সেই সময় আমার মত ভদ্র বালক আর কেউ নাই। পাশের দুই একজন বাকা চোখে দেখে একটু নড়েচড়ে বসলো। তারপর একটু শান্তি মনে মনে ভাবছি এই যাত্রায় মনে হয় রক্ষা পেলাম। কিছুক্ষন পর আবার গলায় খুশখুশি শুরু হয়ে গেছে। আমি পুরা শক্তি লাগায় দিলাম যে করেই হক এইবার আর কাশি হতে দেওয়া যাবে না। ঘন ঘন ঢোগ গিলে গলা ভিজাতে ভিজাতে মুখ শুকিয়ে খান খান। সব ব্যারিকেড দেওয়ার পরেও আর বাধ মানছে না।

অবশেষে ধুর কে কি মনে করবে করুক। গলা ছেড়ে কাশি দেওয়া শুরু করলাম। ভাগ্যিস আমি মাস্ক পরে একেবারেই ডান পার্শে ছিলাম। মাঝখানে থাকলে কি যে একটা অবস্থা হত।

এই করোনায় কোন বিপদেই না ফেললো হাঁচি কাশিও এখন শান্তি মত দেওয়া যায় না।

রংপুরে রক্ত দিতে গেলেই একটা ঘটনা মনে পরে আর খুব হাসি পায়। একবার রক্ত দিতে গিয়েছিলাম রংপুরে। রক্ত নেওয়ার আগেই রক্তের গ্রুপ আর ক্রস ম্যাচ করার জন্য পরীক্ষা করে আবিষ্কার করলো আমার রক্তের গ্রুপ "এ পজিটিভ"। আমি অনেকে বিনয়ের সাথে বলেছিলাম ভাই কোথাও ভূল হচ্ছে আমার রক্তের গ্রুপ "এ নেগেটিভ"। উনি কোন মতেই বিশ্বাস করছে না। বার বার চেষ্টা করেও "এ পজিটিভ"। আমি ওনাকে বললাম ভাই আমি অলরেডি চার বার ব্লাড ডোনেট করেছি আপনি একটু ভালো করে দেখেন। ওনাকে বললাম রিএজেন্ট টা একটু চেঞ্জ করে অন্য কোম্পানির দিয়ে দেখেন। এই কথা বলাতেই উনি রেগে গেলেন। বলে আমার বিশ বছরের অভিজ্ঞতা আপনি আমাকে শেখাবেন। এই নিয়ে এক পর্যায়ে তুমুল ঝোগরা। ভাবা যায় আমার এ নেগেটিভ রক্তের গ্রুপ কে উনি পজিটিভ বানায় দিয়েছিল। তারপর তো অন্য আরেকটি ব্লাড ব্যাংকে গিয়ে রক্ত দিলাম।

আসলে ব্যাঙ্গের ছাতার মত যত্রেতত্রে ক্লিনিক গুলো গড়ে উঠেছে গরীব মানুষদের পকেট কাটার জন্য। এই সকল ক্লিনিক গুলো নামকা ওয়াস্তে একটা ক্লিনিক। খালি কোন মতে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে বোড ঝুলিয়ে দিয়েছে। আর নিম্ন স্তরের মানুষদের ভোলাভালা মানুষদের সেখানে নিয়ে গিয়ে গলা কাটে অনেক গরীব মানুষদের আরো পথে বসিয়ে দেয়। সহজ সরল মানুষদের সরলতার সুযোগ নিয়ে মূলত ঠোকানোই এদের মূল কাজ।

20210412_183514.jpg

20210412_183555.jpg