করোনাকালীন লকডাউনের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখা...

চোখ খুলে নাসরিন দেখতে পেল তাকে ঘিরে মোটামুটি একটা ভীর পাকিয়ে গেছে । শাহবাগ মোড় থেকে একটু পিছনে রাস্তায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে নাসরিন । তার চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনা হয়েছে । নাসরিনের কানে এলো কেউ বলছে "মহিলাডা মনে হয় ভাল না"। এসব কথা কানে নেয়ার চেয়ে আবার হাটা শুরু করা ভালো । রোজা রেখে কম করে দু'মাইল হেঁটে শাহবাগে মাথা ঘুরে পরে যায় সে । জ্ঞ্যান হওয়ার পর থেকে কোনদিন নিজ থেকে রোজা ভাঙ্গেনি সে । কিন্তু আজ মনে হয় সম্ভব হবে না । কাল রাতে সে খোঁজ পায় যে আজ নাকি বাংলামোটরের এক জায়গায় গরিবদের চাল ডাল আরো কী কী জানি দিবে । সকাল সকাল রওনা হয়ে যায় সে। বিগত দুই দিনে চিড়া ভিজিয়ে খাচ্ছে তার পরিবার । তিন ছেলেমেয়ে আর নাসরিনের এক বেহেশতী পরিবার।
বাংলামোটরে নির্দিষ্ট স্থানে এসে নাসরিনের বুক দুরুদুরু করতে থাকে । গলির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মানুষ আর মানুষ । বেশিরভাগ মানুষের হাতেই ভোটার আইডি কার্ড । তার কাছে তো একটা ব্যাগ ছাড়া কিছুই নেই । দূরে একটা নীল রংয়ের পিকআপ, এই পিকআপ থেকেই ত্রাণ দেওয়া হবে তাইলে । লোকমুখের গুঞ্জনে নাসরিন জানতে পারলো যে ভোটার আইডি কার্ড ছাড়া ত্রাণ তো দেওয়া হবেই না বরং এই এলাকার বাসিন্দা হতে হবে । অভিমানে চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসলো নাসরিনের । আজ নাকি তার এলাকায় কোন একটা সংগঠন শাক-সবজি দিবে । সেটা ফেলে এতদূর এদিকে আসলো সে, এত দূর আসা টা কী তাহলে অযথা?
লাইনের মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে ভীড়ে পিষে যাচ্ছে নাসরিন । ত্রাণের প্যাকেট মনে হয় শেষের দিকে । ভীড় আর হট্টগোল এখন বেড়ে যাচ্ছে । লাইন ভেঙে ভীড়ের স্রোতে পিকআপের একদম সামনে এসে পড়ল সে । পিকআপের উপর থেকে ৪-৫ জন খুব দ্রুততার সাথে ত্রাণের প্যাকেট দিচ্ছে । তাকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া একটা প্যাকেট কে জানি টান দিয়ে নিয়ে নিল । হাতে এসেও আসলো না! হাত দুটো উপরে তুলে প্রায় সবাই বলছে "ভাই সকাল-থে খাড়ায় আছি", নাসরিনও তার ব্যতিক্রম নয় । হঠাৎ সে অনুভব করলো পিছন থেকে কেউ তার বুকে হাত দিচ্ছে । নাসরিন হাত নামালো না, আরো জোরে বলতে লাগল "ভাই সকাল-থে খাড়ায় আছি"।
নাসরিনের হাতে নীল রংয়ের একটা প্যাকেট । উত্তেজনায় ঠিকঠাক দেখেনি সে, তবে প্যাকেটে চাল ডাল আলু লবণ তেল আরো কী কী জানি আছে । মাথায় কাপড় দিয়ে ভিড় ঠেলে ফিরতে শুরু করল সে ।প্যাকেটটা বুকে চেপে ধরে "ভাই চাপেন" বলতে বলতে ভিড় ঠেলে এগুচ্ছে নাসরিন । বেদনার রং নীল দেখেই কীনা, নাসরিনের দুই চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে, গলা বসে আসছে । না, কোনরকম বড়লোকের মুডসুইং এর কান্না নয় । এই কান্নার কোনো নাম নেই, কোনো দাম নেই ।
পুরো রাস্তা দোয়া দুরুদ পড়তে পড়তে এসেছে নাসরিন । তার বড় ছেলে যখন হয়েছিলো, তখন ওকে নিয়ে রাস্তায় বের হলে সবসময় মনে একটা ভয় কাজ করত, যে এখনই মনে হয় কেউ বাচ্চাটাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে । আজ ঠিক সেরকমই একটা ভয় হচ্ছিলো নাসরিনের । মনে হচ্ছিলো প্যাকেটটা কেউ ছিনিয়ে নিয়ে যাবে । রাস্তায় একবারও বুকের থেকে প্যাকেটটা দূরে সরেনি তার ।
নাসরিনের ঘরের সবার মুখে হাসি । বড় ছেলে ঠিকই এলাকায় লাইনে দাঁড়িয়ে সবজি নিয়ে এসেছে । ছেলেরা সুর করে পড়ছে । চুলায় রান্না চড়িয়ে নাসরিন নামাজে দাঁড়িয়েছে । অনেক নামাজ পড়তে হবে আজ, অনেক নফল নামাজের নিয়ত করেছে সে । নামাজের নিয়ত করলে নাকি কাউকে বলতে হয়না ।
এ প্যাকেট অফ স্যাডনেস।
১৭ই মে, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ।
Congratulations @tajimkhan! You have completed the following achievement on the Hive blockchain and have been rewarded with new badge(s) :
Your next target is to reach 50 upvotes.
You can view your badges on your board and compare yourself to others in the Ranking
If you no longer want to receive notifications, reply to this comment with the word
STOPCheck out the last post from @hivebuzz: